আজ ফাইনাল, ভারতের ‘বিভীষণ’ এই ক্রিকেটার !

জসপ্রীত বুমরাহ ও অর্শদ্বীপ সিং যদি প্রথম কয়েক ওভারে অ্যালেন ও সেইফার্টকে আটকাতে পারেন তাহলে ম্যাচ অনেকটাই ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয় এটি এখন আবেগ, স্মৃতি আর প্রত্যাশায় মোড়া। ৮ মার্চ রবিবারের রাতটাও তেমনই এক মুহূর্ত হয়ে উঠতে চলেছে। যখন কোটি কোটি ভারতীয় সমর্থকের চোখ থাকবে আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের দিকে। স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে সেই মাঠে হবে নতুন এক ইতিহাসের হাতছানি। টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ভারত ও নিউজিল্যান্ড। একদিকে দেশের মাটিতে শিরোপা ধরে রেখে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে লড়াই। সব মিলিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের নজর এখন এই মহারণে। এই বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের পারফরম্যান্স সত্যিই প্রশংসনীয়। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বে ভারত শুরু থেকেই ভালো খেলছে। ব্যাটিংয়ে আগ্রাসন, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে তীক্ষ্ণতা। সব মিলিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে ভারত। সেমিফাইনালে শক্তিশালী টিম ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ভারত ফাইনালে পৌঁছেছে দাপটের সঙ্গে। বোলিং আক্রমণে জসপ্রীত বুমরাহ ও আর্শদ্বীপ সিং বারবার প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেছেন। আর ব্যাট হাতে সঞ্জু স্যামসন ও অন্য ব্যাটাররা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলকে এগিয়ে দিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ভারতীয় শিবির।

তবে ফাইনাল মানেই অন্যরকম চাপ। আর প্রতিপক্ষ যখন নিউজিল্যান্ড। তখন সতর্কতা আরও বাড়িয়ে দিতে হয়। কিউরিয়া বরাবরই বিপজ্জনক দল। বিশেষ করে ওপেনিং জুটি ফিন অ্যালেন ও টিম সেইফার্ট এই টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। সেইফার্ট ইতিমধ্যেই ৮ ম্যাচে ২৭৪ রান করে দলের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছেন। তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৬০-এর উপরে। যা টি-২০ ফরম্যাটে ভীষণ কার্যকর। অন্যদিকে ফিন অ্যালেন একেবারে বিস্ফোরক ব্যাটার। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাঁর ৩৩ বলে শতরান ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দিয়েছে। শুরুতেই যদি এই দুজন জমে যান তাহলে ভারতের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যেতে পারে। নিউজিল্যান্ডের আরেকটি বড় শক্তি অলরাউন্ডার রাচিন রবীন্দ্র। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই ক্রিকেটার ব্যাট ও বল দুই ক্ষেত্রেই দারুণ ফর্মে রয়েছেন। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি স্পিন বোলিংয়েও গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়েছেন তিনি। মাঝের ওভারগুলোতে তাঁর স্পিন ভারতের রান তোলার গতি কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ভারতীয় ব্যাটারদের তাঁর বিরুদ্ধে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলতে হবে।

ম্যাচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আমেদাবাদের মাঠের পরিস্থিতি। নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম, যেখানে লক্ষাধিক দর্শক গ্যালারিতে বসে ম্যাচ উপভোগ করতে পারেন। গুজরাতের গরম আবহাওয়ায় ম্যাচের সময় তাপমাত্রা ৩২-৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ইনিংসে শিশির পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই টস এখানে বড় ভূমিকা নিতে পারে। পিচ যদি কালো মাটির হয়, তাহলে শুরুতে পেসাররা বাউন্স পেতে পারেন এবং মাঝের ওভারগুলোতে স্পিনাররা সুবিধা পেতে পারেন। বড় বাউন্ডারি হওয়ায় এখানে ১৭০-১৮০ রান ভালো স্কোর হিসেবে ধরা হয়। যদিও ব্যাটিং সহায়ক পিচ হলে ২০০ রানও সম্ভব। তবে এই মাঠের সঙ্গে ভারতের একটি বেদনাদায়ক স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে এখানেই অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে ভারতের স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনও অনেক সমর্থকদের মনে দাগ কেটে আছে। তাই রবিবারের ম্যাচ ভারতীয় দলের জন্য শুধু একটি ট্রফি জেতার সুযোগ নয়, বরং সেই পুরনো হতাশা ভুলে নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগও।

ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে শুরুতেই নিউজিল্যান্ডের ওপেনিং জুটি ভেঙে দেওয়া। জসপ্রীত বুমরাহ ও অর্শদ্বীপ সিং যদি প্রথম কয়েক ওভারে অ্যালেন ও সেইফার্টকে আটকাতে পারেন তাহলে ম্যাচ অনেকটাই ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। একই সঙ্গে ফিল্ডিংয়ে কোনও ভুল করা চলবে না। বড় ম্যাচ ছোট একটি ভুলই পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। রবিবারের ফাইনাল শুধু একটি ক্রিকেট ম্যাচ নয়। এটি আবেগ, প্রত্যাশা ও ইতিহাসের লড়াই। গ্যালারিতে বসে লক্ষাধিক সমর্থক আর টেলিভিশনের সামনে কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষা করবেন একটি মুহূর্তের জন্য যখন ভারতীয় দলের হাতে আবারও বিশ্বকাপ উঠবে কি না। ভারত ইতিমধ্যেই টি-২০ বিশ্বকাপ দুবার জিতেছে। প্রথমবার ২০০৭ সালে অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ও পরে আবারও একবার ট্রফি জিতেছে ভারত। এবার জিতলে ভারতের ঝুলিতে তৃতীয় টি-২০ বিশ্বকাপ আসবে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড এখনও পর্যন্ত একবারও টি-২০ বিশ্বকাপ জেতেনি। তাই এবারের ফাইনাল জিততে পারলে নিউজিল্যান্ডের জন্য এটি হবে প্রথম টি-২০ বিশ্বকাপ শিরোপা। যদি ভারত নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারে তাহলে ইতিহাস লেখা সম্ভব। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের মতো লড়াকু দলকে হারাতে হলে নিখুঁত ক্রিকেট খেলতেই হবে। রবিবারের রাত যত গড়াবে উত্তেজনাও তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত কে জিতবে তা তো সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত এই ফাইনাল ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে অনেক দিন ধরে থেকে যাবে। আর হয়তো রবিবারের রাতেই আমেদাবাদের আকাশে নতুন ইতিহাসের আলো জ্বলেও উঠতে পারে ভারতের জন্য। সবটাই সময়ই বলবে।