পিতৃহত্যার বদলা, কাকে টার্গেট মোজতবার ?

মোজতবা খামেনি একজন মধ্যম স্তরের আলেম, তিনি এখনও আয়াতোল্লা উপাধি অর্জন করেননি। তবুও দীর্ঘদিন ধরেই তিনি তাঁর বাবার দফতরের এক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আড়ালে থাকা শক্তি হিসেবে পরিচিত।

রিয়া  দাস, সাংবাদিক  : পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে কখনও কখনও একটি ঘটনা গোটা ক্ষমতার কাঠামোকে মুহূর্তে বদলে দিতে পারে। ইরানেও ঠিক তেমনই এক নাটকীয় পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর মৃত্যুর পর। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে তেহরানে চালানো এক ভয়াবহ হামলায় নিহত হন ইরানের এই দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা। সেই ঘটনার পর থেকেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে শুরু হয় জোর আলোচনা। কে হবেন দেশের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা। কয়েকদিন ধরে নানা জল্পনা কল্পনার পর অবশেষে সামনে আসে একটি নাম খামেনেইয়ের দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি জানিয়েছেন, মোজতবা খামেনেইকেই দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনই তেহরানে খামেনেই পরিবারের বাসভবনে যে হামলা হয় সেটিই এই নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা করে। ওই হামলায় নিহত হন আলি খামেনেই। শুধু তিনি নন একই হামলায় প্রাণ হারান মোজতবা খামেনেইর মা, স্ত্রী ও এক বোনও। সেই সময় বাড়িতে না থাকায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান মোজতবা। এই ঘটনায় শুধু ইরান নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়াই নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বহু বছর ধরে আলি খামেনেই ইরানের রাজনীতি, সামরিক কৌশল ও ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ফলে ক্ষমতার শীর্ষে তৈরি হওয়া শূন্যতা দ্রুত পূরণ করা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই পরিস্থিতিতেই সামনে আসে তাঁর পুত্র মোজতবার নাম। 

১৯৬৯ সালে ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম মোজতবা খামেনেইয়ের

দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির ক্ষমতার পর্দার আড়ালের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি

তিনি বড় হয়ে ওঠেন এমন এক সময়ে যখন ইরানে শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভির

রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল

তাঁর বাবা আলি খামেনেই তখন শাহবিরোধী আন্দোলনের

অন্যতম সক্রিয় আলেম ছিলেন ও একারণে বহুবার গ্রেফতারও হন

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর পরিস্থিতি বদলে যায়

খামেনেই পরিবার তেহরানে চলে আসে

সেখানেই মোজতবা পড়াশোনা করেন এলিট আলাভি হাই স্কুলে

যা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তৈরির জন্য পরিচিত

পরে তিনি তেহরান ও কুম শহরে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন

রক্ষণশীল আলেম মহম্মদ তাকি মেসবাহ ইয়াজদি-সহ

একাধিক প্রভাবশালী ধর্মীয় শিক্ষকের অধীনে পড়াশোনা করেন

যদিও মোজতবা খামেনি একজন মধ্যম স্তরের আলেম, তিনি এখনও আয়াতোল্লা উপাধি অর্জন করেননি। তবুও দীর্ঘদিন ধরেই তিনি তাঁর বাবার দফতরের এক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আড়ালে থাকা শক্তি হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে তাঁর প্রভাব ছিল যথেষ্ট গভীর। অনেকেই তাঁর ভূমিকাকে তুলনা করেন আহমদ খামেনেইয়ের সঙ্গে, যিনি তাঁর বাবা রুহুল্লাহ খামেনেইয়ের প্রধান আস্থাভাজন এবং ক্ষমতার গেটকিপার হিসেবে কাজ করেছিলেন। বিশেষ করে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসির সঙ্গে মোজতবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করা হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মোজতবা খামেনেই হাবিব ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তিনি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে বাসিজ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ইরানের ক্ষমতার রাজনীতিতে তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তবে সমালোচনাও কম নয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও কিছু বিদেশি সরকার অভিযোগ করে এসেছে যে, নির্বাচনী রাজনীতি ও নিরাপত্তা দমননীতিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে এবং দাবি করে, আলি খামেনেই তাঁর কিছু ক্ষমতা আগেই ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তবে মোজতবা খামেনির সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পথ একেবারেই সহজ ছিল না। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সুপ্রিম লিডার হতে হলে একজনকে উচ্চপদস্থ ধর্মীয় আলেম হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হয় এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতাও থাকতে হয়। সেই কারণে তাঁর নাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ছিল। কারণ তিনি এখনও আয়াতোল্লা পদমর্যাদার আলেম নন। তাছাড়া ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে বাবা থেকে ছেলের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত সংবেদনশীল।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসই দেশের পরবর্তী সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করার ক্ষমতা রাখে। এই সংস্থা যোগ্য ধর্মীয় আলেমদের মূল্যায়ন করে এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মানদণ্ড পূরণকারী একজনকে নির্বাচিত করে। প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো শূন্যতা না তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে মোজতবা খামেনেই নির্বাচন তাই শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়। বরং ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরান এখন এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। বহু বছর ধরে যে নেতৃত্ব দেশটিকে পরিচালনা করেছে তার অবসানের পর নতুন নেতৃত্ব কতটা স্থিতিশীলতা আনতে পারবে। তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটোই রয়েছে। মোজতবা খামেনেইয়ের হাতে ক্ষমতার ভার পড়ায় এখন সবার নজর। তিনি কি তাঁর বাবার উত্তরাধিকার ধরে রাখতে পারবেন নাকি ইরানের রাজনীতিতে শুরু হবে সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়ের।