কেন তাঁকে ঘিরে এত বিতর্ক আর ভোটের আগে তাঁর আগমন বাংলার রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বঙ্গ পেল নতুন রাজ্যপাল। বৃহস্পতিবার লোকভবনে শপথ নিলেন অভিজ্ঞ প্রশাসক এবং প্রাক্তন আইপিএস অফিসার আর এন রবি। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান কলকাতা হাই কোর্ট-এর প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। তবে অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির কোনও প্রতিনিধিও। নির্বাচনের আগে নতুন রাজ্যপাল নিয়োগ ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। কিন্তু কে এই আর. এন. রবি? কেন তাঁকে ঘিরে এত বিতর্ক আর ভোটের আগে তাঁর আগমন বাংলার রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে?
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ কলকাতার লোকভবনে অনুষ্ঠিত হয় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। রাজ্যের ২২তম রাজ্যপাল হিসেবে শপথ নেন আর এন রবি। শপথবাক্য পাঠ করান কলকাতা হাই কোর্ট-এর প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। অনুষ্ঠানের শুরু এবং শেষে জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম’ বাজানো হয়। শপথের পরে সৌজন্য বিনিময় করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নবনিযুক্ত রাজ্যপাল। সূত্রের খবর, সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেন- “বাংলাকে যারা ভালোবাসে, বাংলাও তাঁদের ভালোবাসে।
এই নিয়োগের পেছনে রয়েছে এক নাটকীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি। গত ৫ মার্চ আচমকাই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস পদ থেকে ইস্তফা দেন। তারপরই কেন্দ্রের তরফে ঘোষণা করা হয় নতুন নাম। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল আর এন রবি-কেই পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বুধবারই তিনি কলকাতায় পৌঁছন এবং বৃহস্পতিবার শপথ গ্রহণ করেন।
দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য কেন্দ্রীয় মহলে পরিচিত নাম আর এন রবি। তাঁর পুরো নাম রবীন্দ্র নারায়ণ রবি। ১৯৫২ সালের ৩ এপ্রিল বিহারের পটনায় জন্ম তাঁর। শিক্ষাজীবনে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি ভারতীয় পুলিশ পরিষেবায় যোগ দেন। তিনি কেরল ক্যাডারের একজন আইপিএস কর্মকর্তা ছিলেন।
পুলিশ জীবনে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি Central Bureau of Investigation এবং Intelligence Bureau-এর গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। দুর্নীতি দমন এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান হন। পরবর্তীকালে ভারতের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে তিনি নাগাল্যান্ড-এর রাজ্যপাল নিযুক্ত হন। সেই সময় নাগা বিদ্রোহী সংগঠন National Socialist Council of Nagaland-এর সঙ্গে শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারত সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত মেটাতে এই আলোচনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২১ সালে তিনি তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টেলিন-এর নেতৃত্বাধীন দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম সরকারের সঙ্গে একাধিক ইস্যুতে সংঘাত তৈরি হয়। বিধানসভায় পাস হওয়া বিল আটকে রাখা নিয়ে বড় বিতর্ক হয়। এই নিয়ে বিষয়টি পৌঁছে যায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। এছাড়া National Eligibility cum Entrance Test সংক্রান্ত বিল নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়।
বাংলায় নতুন রাজ্যপালের নাম ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন- রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি কটাক্ষ করে বলেন- নতুন রাজ্যপাল বিজেপির “ক্যাডার”।
বৃস্পতিবারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বিরোধী শিবিরের অনুপস্থিতিও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এমনকি ভারতীয় জনতা পার্টি-র কোনো প্রতিনিধিকেও দেখা যায়নি। এই ঘটনাকে অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে নতুন রাজ্যপালের আগমন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রাজ্যপালের ভূমিকা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সাংবিধানিক পরিস্থিতি তৈরি হলে রাজ্যপালকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে- তামিলনাড়ুর মতো পশ্চিমবঙ্গেও কি রাজ্য সরকার এবং রাজ্যপালের মধ্যে সংঘাত তৈরি হবে? নাকি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেবেন? এখনই তার উত্তর পাওয়া কঠিন।
সব মিলিয়ে বাংলার রাজভবনে নতুন অধ্যায় শুরু হল। অভিজ্ঞ প্রশাসক আর এন রবি-র কাঁধে এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একদিকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন। অন্যদিকে রাজ্য ও কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ। এই দুইয়ের মাঝে নতুন রাজ্যপালের ভূমিকা আগামী দিনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।