“মা আর ফিরবো কি না জানি না”, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে উদ্ধার অভিযানে যাওয়ার আগে বললেন ফরিদাবাদের পাইলট।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানের সংঘাত ঘিরে উত্তেজনার চরমে। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সাহসিকতার নজির গড়লেন হরিয়ানার ফরিদাবাদের ২৩ বছরের পাইলট দীপিকা আধানা। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে আটকে পড়া ১৬৯ জন ভারতীয়কে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে এনে তিনি হয়ে উঠেছেন অনন্যা।
উদ্ধার অভিযানে রওনা দেওয়ার কয়েকঘণ্টা আগে দীপিকা তাঁর মাকে ফোনে বলেছিলেন, “বাই বাই মা। জানি না আর ফিরতে পারব কি না।” কথাগুলো শুনে ভয়ে উদ্বেগে কেঁপে উঠেছিল পরিবার। কিন্তু দায়িত্ব পালন করে সশরীরে বাড়ি ফিরলেন সাহসী দীপিকা। শুধু নিজে নয়, দিল্লির মাটিতে দুবাই ফেরত যাত্রীদেরকে নিয়ে নিরাপদভাবে বিমান অবতরণ করালেন ২৩ বছরের সাহসী মেয়েটি।

দীপিকা এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের পাইলট। ৬ মার্চ সকাল প্রায় ১০টা ১৫ মিনিট নাগাদ আচমকাই নির্দেশ আসে—তাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির রাস আল খাইমাহ-এ যেতে হবে উদ্ধার অভিযানের বিশেষ উড়ানে। প্রথমে অন্য এক পাইলটের ওই ফ্লাইট পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু যাত্রার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে দীপিকাকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ফ্লাইটটিতে ছিল সম্পূর্ণ মহিলা ক্রু। ক্যাপ্টেন ছিলেন জস্বিন্দর কৌর। তাঁর সঙ্গে কো-পাইলট হিসেবে ছিলেন দীপিকা আধানা। কেবিনে ছিলেন আরও চার জন মহিলা কর্মী। যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে কিছুটা ভয় থাকলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর আস্থা রেখেই তাঁরা উড়ান চালান একেবারে অন্যান্য দিনের মতোই।
বিমানটি দুপুর ২টোর সময় রাস আল খাইমাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীপিকার কথায়, “বিমানবন্দরে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় নিস্তব্ধতা বেশি ছিল। তবে আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়নি। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে ১৬৯ জন ভারতীয় যাত্রীকে বোর্ডিং করানো হয়। বিকেল সাড়ে ৩টা নাগাদ দিল্লির উদ্দেশে ফেরার উড়ান শুরু হয়। তবে উড়ানের সময় এক মুহূর্তের জন্য পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। হঠাৎ করেই এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিছু সময়ের জন্য নেটওয়ার্ক ব্যর্থতার কারণে যোগাযোগ বন্ধ ছিল। যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই সংযোগ ফিরে আসে এবং ফ্লাইট স্বাভাবিক ভাবে এগিয়ে যায়।”

শেষ পর্যন্ত বিমানটি নিরাপদে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো সংকট থেকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিমান থেকে নেমেই ক্রু সদস্যদের ধন্যবাদ জানান যাত্রীরা।
দীপিকার মা বাবলি আধানা বলেন, “ও যখন বলেছিল—‘মা, বাই বাই, জানি না ফিরতে পারব কি না’, তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ও যে এত মানুষকে নিরাপদে ফিরিয়ে এনেছে, তাতে আমি খুব গর্বিত।”
ফরিদাবাদের তিগাঁও এলাকার বাসিন্দা দীপিকা। তাঁর বাবা যোগেশ আধানা পেশায় আর্কিটেক্ট বা স্থপতি, মা গৃহবধূ। বড় ভাই মুম্বইয়ে একটি ব্যাঙ্কে কাজ করেন।
পাইলট হওয়ার স্বপ্নের পেছনে রয়েছে পারিবারিক অনুপ্রেরণার কথা জানিয়েছেন এই সাহসী পাইলট। দীপিকার কথায়, তাঁর প্রয়াত দাদু অমৃত সিং আধানা চেয়েছিলেন নাতনি একদিন পাইলট হোক। সেই স্বপ্নই তাঁকে এই পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করেছে। “আমার পরিবার সব সময় পাশে ছিল,” বলেন তিনি।
বল্লভগড়ের টেগোর স্কুল থেকে ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন দীপিকা। এরপর দিল্লিতে কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল)-এ প্রশিক্ষণ শুরু করেন। কোভিড অতিমারির কারণে এক বছর বাড়িতে বসেই পড়াশোনা চালাতে হয় তাঁকে। ২০২১ সালে সিপিএল লাভ করেন তিনি।
২০২২ সালে মধ্যপ্রদেশের রেওয়ার ফ্যালকন অ্যাভিয়েশন অ্যাকাডেমিতে গিয়ে ২০০ ঘণ্টার উড়ান সম্পূর্ণ করেন। ২০২৩ সালে গ্রিস ও ইস্তানবুলে গিয়ে এয়ারবাস এ-৩২০ বিমানের জন্য টাইপ রেটিং প্রশিক্ষণ নেন।
একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের লিখিত পরীক্ষা ও ইন্টারভিউতে উত্তীর্ণ হন তিনি। ২০২৪ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই সংস্থায় যোগদান। যুদ্ধের আবহে সেই দায়িত্ববোধই উজ্জ্বল হয়ে উঠল দীপিকার সাহসী উড়ানের মাধ্যমে।