“মাসিকের ছুটি বাধ্যতামূলক হলে মহিলাদের চাকরি কমতে পারে”

এ ধরনের আইন কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ধারণা তৈরি করতে পারে—যেন তাঁরা পুরুষদের তুলনায় ‘কম সক্ষম’।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক :  মাসিকের সময় নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটির দাবি নিয়ে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সুপ্রিমকোর্টের। শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত শুক্রবার বলেন, “আইন করে মাসিকের ছুটি বাধ্যতামূলক করা হলে, তা মহিলাদের কর্মসংস্থানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”

শুনানির সময় প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, “যদি আমরা এমন আইন করি, তাহলে অনেক নিয়োগকর্তাই মহিলাদের চাকরিতে নেবেন না।” তাঁর মতে, এ ধরনের আইন কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ধারণা তৈরি করতে পারে—যেন তাঁরা পুরুষদের তুলনায় ‘কম সক্ষম’।

আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী এই জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ছাত্রীরা এবং কর্মজীবী নারীরা মাসিকের সময় ছুটি পেতে পারেন—এমন নিয়ম তৈরির নির্দেশ দিক সুপ্রিমকোর্ট। কিন্তু এই দাবি নিয়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সচেতনতা তৈরি করা এক জিনিস, আর আইন করে বাধ্যতামূলক করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, “সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। কিন্তু একে আইনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করলে নিয়োগকর্তাদের মানসিকতা ভিন্নভাবে কাজ করবে। তখন তাঁরা ভাবতে পারেন, মহিলাদের নিয়োগ দিলে অতিরিক্ত ছুটি দিতে হবে।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে মাসিক যেন কোনও ‘অসুস্থতা’ বা ‘খারাপ কিছু’ ঘটছে। ফলে সমাজে নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।

শুনানির সময় সিনিয়র আইনজীবী এম আর শামশাদ আদালতের নজরে আনেন, ২০১৩ সালে কেরল সরকার রাজ্যের সমস্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য মাসিকের ছুটি চালু করেছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেছিলেন, লিঙ্গ-সমতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে প্রধান বিচারপতি জানান, এই ধরনের সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আইন করে বাধ্যতামূলক করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাঁর কথায়, “যদি আইন করে বলা হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই চাকরির সুযোগ কমে যেতে পারে। এমনকি বিচারব্যবস্থা বা সরকারি চাকরিতেও মহিলাদের নিয়োগে অনীহা দেখা দিতে পারে।”

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ বলেছিল, মাসিক স্বাস্থ্য একটি কিশোরীর জীবন, মর্যাদা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সরকারগুলির উপর নারীদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষার দায়বদ্ধতা রয়েছে বলেও আদালত জানিয়েছিল। সেই রায়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ, পৃথক ও কার্যকর শৌচালয় এবং মাসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মাসিকের ছুটি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। একদিকে কর্মক্ষেত্রে নারীর শারীরিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠছে, অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন—আইন করে তা বাধ্যতামূলক করলে কর্মসংস্থানে নারীরা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন। সুপ্রিমকোর্টের পর্যবেক্ষণে সেই বিতর্কই নতুন করে সামনে এল।