আলি লারিজানিকে হত্যার দাবি ইজরায়েলের

লারিজানিকে সর্বশেষ জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল গত শুক্রবার তেহরানে আয়োজিত আল-কুদস দিবসের সমাবেশে। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মিছিলে যোগদান করেন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আগুন নেভার আগেই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের হত্যার খবর । যা নতুন যুদ্ধের ঘৃতাহুতির কাজ করল। আলি লারিজানিকে হত্যার দাবি করা হয়েছে ইজরায়েলের তরফে। দাবি করা হয়েছে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের তরফে। যদিও এবিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি ইরানের তরফে। লারিজানিকে সর্বশেষ জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল গত শুক্রবার তেহরানে আয়োজিত আল-কুদস দিবসের সমাবেশে। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মিছিলে যোগদান করেন।

তেহরান এখনো লারিজানির হত্যা নিশ্চিত করেনি। তবে এই হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হলে ,২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইজরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর তেহরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার হত্যা হবে এটি। এর আগে হামলার প্রথম দিনই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই সপরিবারে নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রকাশ্যে আসেন আলি লারিজানি।তিনি একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠনের কথা ঘোষণা করেন। ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। সম্ভাব্য অস্থিরতা বা বিভাজনের আশঙ্কা মাথায় রেখে কঠোর বার্তাও দেন।ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ যদি পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে—এমন সতর্কবার্তাও দেন তিনি।

তবে প্রশ্ন হল হত্যার বিষয় নিশ্চিত না হলেও। লারিজানি যে টার্গেট সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। চলুন আপনাদেরকে একটু বুঝিয়ে বলি, কে এই লারিজানি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সবসময় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইর প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছেন লারিজানি। দেশের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত সম্পর্ক গড়ে তোলারও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।আলি লারিজানি ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের একজন প্রভাবশালী নেতা। আন্তর্জাতিক স্তরে তিনি পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার তদারকি করেন। অবশ্য সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ওয়াশিংটন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

লারিজানি বিভিন্ন সময় মস্কো সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ট্রাম্পের চাপের বিরুদ্ধে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম এমন এক প্রধান মিত্র ও বিশ্বশক্তির সঙ্গে খামেনেইর সম্পর্ক সামলাতে তার এই সফর সহায়ক হয়। লারিজানিকে চীনের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে ২০২১ সালে ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি সই হয়।

আলি লারিজানি প্রায় ২০ বছর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছিলেন। ২০২৫-এ ইরান-ইজরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর তিনি আবারো এই পর্ষদের নেতৃত্বে ফিরে আসেন। লারিজানি ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর প্রাক্তণ সদস্য। ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন।সেই সময় পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ করার বিনিময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর দেওয়া সুযোগ-সুবিধার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি চকলেটের বিনিময়ে মুক্তা চাওয়ার মতো। বিশ্লেষকদের কথায়, সেসময় লারিজানি কূটনীতির মাধ্যমে পশ্চিমাদের রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। তখন তাকে একজন বাস্তববাদী নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে মনে করা হতো।

লারিজানি ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। সেই মেয়াদে থাকাকালীন ২০১৫ সালে ছয়টি বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরান একটি পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছায়। ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। লারিজানি বহুবার দাবি করেছেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কখনোই ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব নয়।

২০০৫ সালে লারিজানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ে ব্যর্থ হন। পরে তিনি ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছিলেন। কিন্তু দুইবারই গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে। অযোগ্যতার কারণ হিসেবে জীবনযাত্রার মান এবং বিদেশে পারিবারিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়।১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে ইরানের এক নেতৃস্থানীয় আলেম পরিবারে জন্ম লারিজানির। শৈশবেই ইরানে চলে আসেন এবং পরে দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার ভাইদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিচার বিভাগ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রক সহ শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন।জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে লারিজানির ভূমিকার কারণে ক্ষুব্ধ ইরানি-আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতিবাদের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক পদ থেকে তার মেয়েকে বরখাস্ত করা হয়।

মধ্য-প্রাচ্যের যুদ্ধের সময়সীমা যতই বাড়বে টার্গেট হবে হরমুজ প্রনালী। হরমুজে ইরান কড়াকড়ি করলে গ্যাস থেকে শুরু করে পেট্রোপণ্যে মুল্যমৃদ্ধি হবে প্রতিবেশি দেশগুলিতে। প্রথমে খামেনেইর মৃত্যু। তার ওপর ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি ইজরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার দাবি করেছেন ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ। নতুন করে যুদ্ধের অশনি সংকেত দেখছে আর্ন্তজাতিক বিশেষজ্ঞমহল।