সোনারপুর দক্ষিণ নিজের চেনা এলাকা, নিজের মানুষের ভিড় আর অন্যদিকে আসানসোল দক্ষিণ এক ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রাজন্যার জন্।

বিশ্বজিৎ নস্কর ও ছোটন সেনগুপ্ত, নিজস্ব সংবাদদাতা : কখনও কখনও রাজনীতির ভিড়ে হঠাৎ একটি কণ্ঠ আলাদা করে শোনা যায়। যা নতুন প্রজন্মকে দিশা দেখাতে পারে। যে কণ্ঠ শুধু স্লোগান তোলে না, প্রশ্ন তোলে আমাদের মনে। শুধু পথ অনুসরণ করে না নতুন প্রজন্মকে নতুন পথের দিশা তৈরি করতে চায়। রাজন্যা হালদার ঠিক তেমনই এক নাম। ২০২৩-এ ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে তাঁর কণ্ঠস্বর রাজ্যজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। যেন এক তরুণ প্রজন্মের এক নতুন মুখ। তাঁর প্রতিবাদের ভাষও ছিল অন্য। এই পথচলা সহজ ছিল না রাজন্যার। দলীয় পরিচয়ে নিরাপত্তা ছেড়ে আজ তিনি নির্দল প্রার্থী। নিজের বিশ্বাস আর অবস্থানকে সামনে রেখে ভোটের ময়দানে দাঁড়িয়েছেন। সোনারপুর দক্ষিণ নিজের চেনা এলাকা, নিজের মানুষের ভিড় আর অন্যদিকে আসানসোল দক্ষিণ এক ভিন্ন চ্যালেঞ্জ রাজন্যার জন্য। এই দুই কেন্দ্র থেকেই প্রার্থী হয়ে রাজন্যা যেন এর বার্তা দিতে চেয়েছেন। রাজনীতি শুধু দল নয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়ও বটে। কলকাতার প্রেস ক্লাবে নিজের দলের নাম ঘোষণা করার সময় তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভূত মিশ্রণ। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন ২০২৬-এর নির্বাচনে হয়তো তাঁরা ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে পারবেন না কিন্তু লড়াই ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই নেই। বিন্দু বিন্দু করে সিন্ধু হয় এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি এগোতে চান।
তাঁর কথায় উঠে এসেছে সোনারপুর দক্ষিণের বাস্তব চিত্র। খারাপ রাস্তা, খারাপ স্বাস্থ্য পরিষেবা ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুর্ভোগ। একইসঙ্গে আসানসোল দক্ষিণ নিয়েও তাঁর ক্ষোভ স্পষ্ট। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, এলাকার প্রতি অবহেলা। এই অভিযোগগুলো শুধু রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বরং মাটির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দেখা বাস্তবের প্রতিফলন বলেই তুলে ধরতে চেয়েছেন রাজন্যা। তিনি ক্যামেরার সামনে স্পষ্ট ভাষায় বললেন যে, তিনি নেতাজীর মত বিকল্প পথে হাঁটতে চান, উদ্দেশ্য একই রেখে। নতুন কিছু করে দেখাতে চান মানুষের জন্য।
তবে রাজন্যার রাজনৈতিক যাত্রা শুধুই অভিযোগ বা প্রচারের গল্প নয়। এর ভিতরে রয়েছে সংঘাত,বিতর্ক ও ব্যক্তিগত অবস্থানের লড়াই। আরজিকর কাণ্ডের আবহে তাঁর তৈরি করা শর্ট ফিল্ম তাঁকে নিজের দলের বিরাগভাজন করে তোলে। সাসপেশনের পরও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। বরং সেই দৃঢ়তাই যেন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে কসবার ল কলেজে গণধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য দলের অন্দরের নানা অভিযোগ সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক সাহসী যোদ্ধা। ২০২৫-এ বিজেপিতে যোগদানের জল্পনা ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পথ এড়িয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন অবস্থানকেই বেছে নেন। আসানসোল দক্ষিণে তাঁর প্রচারের শুরুটাও যেন প্রতীকী এক ছবি। ২৬-এ বিধানসভায় সোনারপুর দক্ষিণে তৃণমূলের অরুন্ধতী মৈত্র ও বিজেপির রূপা গঙ্গোপাধ্যায় আর আসানসোল দক্ষিণে বিজেপির অগ্নিমিত্রা পাল ও তৃণমূলের তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় মুখোমুখি। এই দুই কেন্দ্রেই মূল লড়াই তৃণমূল বিজেপির মধ্যে। তাই নির্দল রাজন্যা হালদারের জয় কঠিন বলে মনে করেছেন অনেকেই।

ঘাঘরবুড়ি মন্দিরে পুজো দিয়ে হাতে গোনা কয়েকজন সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা। কোনও বড় মঞ্চ নয়, কোনও বিশাল বড় শো নয়। বরং মানুষের দরজায় কড়া নাড়া ও চোখে চোখ রেখে কা বলা। তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময়ও বলছেন, দুই বড় দলকে তো দেখেছেন এবার ঘরের মেয়েকে একবার সুযোগ দিন। এই রাজনীতিতে তিনি পিছিয়ে নেই। তৃণমূল প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়েও অর্থনৈতিক স্বার্থের অভিযোগ তুলেছেন। একইসঙ্গে বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন। এইসব অভিযোগের মধ্যে দিয়ে তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন তিনি মাটির মানুষ।
তবে বাস্তবতা যে কঠিন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তৃণমূল ও বিজেপির মতো দুই শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তির মাঝে নির্দল প্রার্থী হিসেবে জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়। চলুন দেখে নেওয়া যাক ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে সোনারপুর দক্ষিণ ও আসানসোল দক্ষিণের ফলাফল।
২০২১ বিধানসভা নির্বাচন ফলাফল (সোনাপুর দক্ষিণ)
তৃণমূলঃ অরুন্ধতী মৈত্র
বিজেপিঃ অঞ্জনা বসু
জয়ীঃ তৃণমূল প্রার্থী (১০৯,২২২ ভোট)
২০২১ বিধানসভা নির্বাচন ফলাফল (আসানসোল দক্ষিণ)
বিজেপিঃ অগ্নিমিত্রা পাল
তৃণমূলঃ সায়নী ঘোষ
জয়ীঃ বিজেপি প্রার্থী (৮৭,৮৮১ ভোট)
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই লড়াইয়ে টিকে থাকতে গেলে রাজন্যাকে শুধু বক্তব্যে নয়, সংগঠন ও জনসংযোগ দুই ক্ষেত্রেই আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। তবে রাজনীতির ইতিহাস বলছে সব লড়াই সংখ্যার হিসেবে মাপা যায় না। রাজন্যা হালদারের এই পথচলাও হয়তো তেমনই। যেখানে জয়-পরাজয়ের বাইরেও একটি অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা রয়েছে।