এবার ত্রিমুখী লড়াই ত্রিপুরায়

বিজেপি, তিপ্রামথা ও সিপিএম—তিন শক্তির সমীকরণে এবার ত্রিমুখী লড়াই ত্রিপুরার উপজাতি এলাকায়।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : আগামী ১২ এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচন। ত্রিপুরার পাহাড়ের ভাগ্য পরীক্ষা হতে চলেছে এদিন। এডিসি ভোট ঘিরে পাহাড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে। বিজেপি, তিপ্রামথা ও সিপিএম—তিন শক্তির সমীকরণে এবার ত্রিমুখী লড়াই হতে চলেছে।তবে মূল লড়াই বিজেপি এবং তিপ্রামথার মধ্যে ।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সিপাহীজলা জেলা ২২ নং কাঁঠালিয়া-মির্জা-রাজাপুর এডিসি নির্বাচনী কেন্দ্রে তিপ্রামথা দলের পক্ষ থেকে এক বিশাল জনসভা হয়। তিপ্রামথা দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যুৎ বিক্রম মাণিক্য দেববর্মার উপস্থিতিতে ঝড় তোলে নির্বাচনী প্রচারে। ত্রিপুরার রাজপরিবারের বর্তমান প্রধান এবং তিপ্রামথা দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোতবিক্রম মানিক্য দেববর্মা যিনি জনজাতি মানুষজনদের কাছে ‘বুবাগ্রা’ নামে পরিচিত।জনসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিপ্রামথা দলের প্রতিষ্ঠাতা তথা ত্রিপুরার রাজপরিবারের উত্তরসূরি দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোতবিক্রম মাণিক্য দেববর্মা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সংশ্লিষ্ট এডিসি কেন্দ্রের তিপ্রামথা দলের মনোনীত প্রার্থী ডেভিড মুরাসিং সহ দলের অন্যান্য নেতারা। ত্রিপুরা এডিসি নির্বাচনে তিপ্রামথা দলের জয় নিশ্চিত করা এবং জনজাতিদের অধিকার রক্ষায় ‘থানসা’ বা ঐক্যের ডাক দেওয়া হয় জনসভা থেকে। প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন জনজাতি মানুষজনদের ভূমি রক্ষা, শিক্ষা এবং পানীয় জলের সমস্যা। তিনি জনজাতি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিপ্রামথা দলকে ভোট দেন এবং বিজেপির কোনো প্রলোভনের ফাঁদে না পা দেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে এই এডিসি নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি তিপ্রাসা জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই। অভিযোগ বিজেপি সরকার আদিবাসী এলাকার উন্নয়নে পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ করতে ব্যর্থ হয়েছে।তাই জনসভা থেকে বিজেপির ফাঁদে পা না দেওয়ায় জন্য জনজাতি মানুষজনের উদ্দেশ্যে বার্তা রাখেন প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেববর্মা !

প্রদ্যোতের মন্তব্যের জবাবে বিজেপি অভিযোগ করেছে যে, এডিসি নির্বাচনের সময় আদিবাসী এলাকার ভোট পাওয়ার জন্য তাঁর ও তাঁর দল অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তাদের যুক্তি, এ ধরনের বক্তব্য পাহাড়ি অঞ্চলের অনভিজ্ঞ ও প্রথমবারের মতো ভোটদাতাদের বিভ্রান্ত করতে পারে

১২ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, ১৭ তারিখে হবে ফলাফল ঘোষণা। রাজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ এডিসির অধীনে। উপজাতি এলাকায় যে দলের আসন থাকে, ৬০ সদস্যের বিধানসভার ২০টি উপজাতি সংরক্ষিত আসনে তাদেরই প্রভাব থাকে এবং সেই দলই বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই স্থানীয় নির্বাচন হলেও মাত্র দুবছর পরই যে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে, সে রাজ্যের জন্য এডিসি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি এবং তিপ্রামথা দলের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে জোট এবং অভ্যন্তরীণ আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হবার পর দুদলই এক অপরের বিরুদ্ধে এডিসির ২৮ টি আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

এদিকে জয়ের বিষয়ে আশাবাদী বিজেপি।মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার কথায়, ত্রিপুরা জনজাতি অঞ্চল স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচন নিছক একটি নির্বাচন নয়, বরং একটি ইতিহাস তৈরি করার দিন। কারণ এই নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে প্রতিটি আসনে জয়লাভ করবে ভারতীয় জনতা পার্টি। এই দল জনজাতি জনগণের কাছ থেকে ব্যপক সমর্থন পাচ্ছে। এডিসি নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছুদিন আগেই কাঠালিয়া-মির্জা-রাজাপুর আসনের নির্বাচনী এক জনসভায় একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী তিপ্রামথার ৫০০ জনেরও অধিক ভোটারকে ভারতীয় জনতা পার্টিতে স্বাগত জানান, যার মধ্যে রয়েছেন ২০২৩ সালে ধনপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তিপ্রামথা পার্টির প্রার্থী অমিয় দয়াল নোয়াতিয়া, যিনি জনসভার দিন ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেছেন।

২০২১ সালের সর্বশেষ এডিসি নির্বাচনের ঠিক আগে একটি এনজিও থেকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হওয়া তিপ্রামথা গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ডের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছে—এই অঞ্চলটি ত্রিপুরা, আসামের অংশবিশেষ, মিজোরাম এবং দক্ষিণ বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত। পরবর্তীতে, ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সঙ্গে তার জোট আদিবাসী সমস্যাগুলোর সাংবিধানিক সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ২০২৬ এডিসি নির্বাচনের মূল প্রার্থী ও দলীয় তালিকা
বিজেপি- ২৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে
তিপ্রামথা -২৮ জন প্রার্থী দিয়েছে
বামফ্রন্ট – সিপিআই(এম) ২৫ জন, আরএসপি ১ জন এবং সিপিআই ১ জন সহ মোট ২৭ জন প্রার্থী ঘোষণা করেছে
আইপিএফটি – প্রথম দফায় ৯ জন এবং পরবর্তীতে ১৭ জন প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করেছে

সবমিলিয়ে ADC নির্বাচনে ত্রিপুরার পার্বত্য এলাকায় নিজেদের মাটি শক্ত করতে মরিয়া সব রাজনৈতিক দলই।সেইমতো জোরকদমে চলছে রাজনৈতিক প্রচারও।সেই প্রচারে বেরিয়েই এক সাধারন জনজাতি অটোচালকের মুখ থেকে ইংরেজি কথা শুনে অবাক প্রদ্যোতবিক্রম মাণিক্য দেববর্মা ! অটোচালকের সঙ্গে সাবলীল ইংরেজিতে কথোপকথন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। রাজকীয় আভিজাত্য সরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার তাঁর এই ভঙ্গি নেটিজেনদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

প্রদ্যোতবিক্রম মাণিক্য দেববর্মা প্রায়ই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বুঝতে এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নেন। এখন দেখার ত্রিপুরার রাজা-মন্ত্রীর লড়াইয়ে জনগন কাকে বেছে নেন।