২০১১ পর বাংলার ভোটের রাজনীতিতে বদল ঘটেছে তার প্রমাণ ২০২৬। সোজা কথা বাংলার মানুষ এখন পরিববর্তনের পক্ষেই।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ২০১৬ থেকে বাংলা দখলের বীজ রোপণ । ফসল ফলল ২০২৬ এ। বাংলার মসনদ দখল করল বিজেপি। তাহলে কি অপশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধেই বাংলায় ভোট হল। সুশাসনের আশ্রয়েই বাজিমাত করল বিজেপি। বিজেপির উত্থানের পিছনে আসল রসায়নটা কি। বিকল্প হিসাবে বাংলার মানুষ কেন বেছে নিল বিজেপিকে। তবে কি শাসকের দুর্নীতিই বিজেপির আস্তিনের সেই নির্ভরযোগ্য তাস। তৃণমূল সুপ্রিমোকে ফের ইস্যু খুঁজে রাস্তায় নামতে হবে তাহলে। বাংলা জেতার জন্য বিজেপির ফান্ডা লুকিয়ে রয়েছে কয়কটি স্তম্ভের উপর। কী কী অবশ্যই বলবো। তবে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন দেড় দশক পরে তাঁকে হারাতে হবে তার হদিশ বোধহয় পাননি তিনি। আবারও পরিবর্তন দেখল পশ্চিমবঙ্গ। ২০১১ পর বাংলার ভোটের রাজনীতিতে বদল ঘটেছে তার প্রমাণ ২০২৬। সোজা কথা বাংলার মানুষ এখন পরিববর্তনের পক্ষেই। বিজেপি সরকারকেও ভাবাবে এই রায়।
সালটা ২০২১। রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছিল বাংলায়। ২৯২ আসনের মধ্যে তৃণমূল পেয়েছিল ২১৩টি, বিজেপি পায় ৭৭টি আসন। এ ছাড়া বাম জোট একটি ও অন্যান্য দল একটি আসন পায়। শতাংশের বিচারে সাড়ে ৪৮ শতাংশ ভোট পায় তৃণমূল। আর বিজেপির ঘরে যায় ৩৮. ৭ শতাংশ ভোট। বাম জোট পায় ১০. ১ শতাংশ, অন্য দলগুলোর ঝুলিতে গেছে ২.৮ শতাংশ ভোট। এরআগে ২০১৬ নির্বাচন। তৃণমূল পেয়েছিল ২১১ আসন। তাদের ভোট ছিল ৪৪. ৯ শতাংশ। অন্যদিকে বিজেপি আসন ছিল মাত্র তিনটি। আর ভোট ছিল মাত্র ১০ দশমিক ২ শতাংশ। মাঝখানে পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই বিজেপিই পশ্চিমবঙ্গে ৭৭ আসন আর প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে বিধানসভার বিরোধী দলের আসনে বসে। ভাবুন, ২০১৬ সালের পর ২০২১ এ কতটা আসন বাড়িয়েছিল বিজেপি। এরপর বাংলার বিধানসভা দখলে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে বিজেপি। তৃণমূলের বড় নেতাদের দলে টেনে ও জনপ্রিয় তারকাদের মনোনয়ন দিয়ে তৃণমূলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় তারা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারে ১৮ বার পশ্চিমবঙ্গে সফরে গিয়ে ২২টি জনসভায় বক্তৃতা করেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা জেপি নাড্ডা, অমিত শাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা চষে বেড়িয়েছেন নির্বাচনের মাঠ। তার ফল বিজেপি পেয়েছিল ২০২১ এ। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
২০২৬ এ লক্ষ্য করুন এসআইআর দিয়ে শুরু হয় বিজেপির বাংলা দখলের প্রথম পাঠ। ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয় বাংলার এসআইআর পর্ব। আর বাংলায় প্রথম দফার ভোট হয় ২৩ এপ্রিল। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ভোট হয়। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ নির্বাচন থেকে বাদ। অনেকেই বলছেন এসআইআর আতঙ্কেই ভোট হয়েছে বাংলায়। এ ছাড়াও বিজেপি জনসভা ও প্রচারের কৌশল দেখুন। তাহলেই বুঝবেন বাংলা দখলে কতটা পরিকল্পনা কতটা দৃঢ় ছিল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ১৪টি নির্বাচনী কর্মসূচি (জনসভা ও রোড শো করেছেন মোদী । ১৯ এপ্রিল ২০২৬, তিনি একদিনেই রাজ্যে ৪টি জনসভা করেছিলেন। কলকাতার রাজপথে বা কলকাতা-সংলগ্ন হাওড়ার সরু রাস্তাতেও একের পর এক রোড শো করেছেন, আমজনতার হাতের নাগালে এসে ধরা দিয়েছেন। এমন কী, বিজেপি জিতলে শপথ গ্রহণে নিজে আসবেন বলেও ঘোষণা করে গেছেন। বিজেপির পূর্বসূরী জনসঙ্ঘর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, সেখানে শাসকের ভূমিকায় আসাটা বিজেপির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

এবারের নির্বাচনকে বিজেপি সেই স্বপ্নপূরণেরই সেরা সুযোগ হিসেবে দেখেছে এবং যে কারণে নরেন্দ্র মোদী পর্যন্ত রাজ্যের সবগুলো আসনে ‘আমিই প্রার্থী’ বলে ঘোষণা করেছেন। নরেন্দ্র মোদীর ডানহাত অমিত শাহ টানা ১৭ দিন বাংলায় মাটি কামড়ে পড়েছিলেন। প্রথম দফা থেকে দ্বিতীয় দফা ভোট বাংলায় পড়ে থেকে ভোট পর্যবেক্ষণও করেছিলেন। তার ফলাফল মিলল হাতেনাতে। ২০২৬ এ দু’দফায় মোট ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। গত ৩ রা জানুয়ারি শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন.আরও ৬ শতাংশ হিন্দু ভোট পেলেই বিজেপি ক্ষমতায় আসবে। তিনি বলেছিলেন, ‘২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। বিধানসভায় আরও ৬ শতাংশ ভোট পেলেই বিজেপি ক্ষমতায় আসবে।’ নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন শুভেন্দু। তবে তৃণমূলের ঝুলিতে থাকা হিন্দু ভোট ও মহিলা ভোট ঢুকেছে বিজেপির ঝুলিতে। হিন্দু ভোটের মেরুকরণের বিজেপির চেষ্টা সফল হয়েছে। হিন্দুত্ববাদের যে কার্ড নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ বহুদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে ফেলেছেন ভোটাররা তাতে সায় দিয়েছে। হিন্দু ভোটারদের বৃহৎ অংশ এবার বিজেপির ঝুলিতে। সীমান্ত, বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় পরিচয় ইত্যাদি ইস্যুতে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালিয়েছে। যার প্রভাব ভোটের বাক্সে পড়েছে। মুসলমান ভোটারদের বিভাজনকে বিজেপি কাজে লাগিয়েছে। মুসলমান ভোটাররা এবার বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ, তৃণমূল নানা ফ্রন্টে ভাগ হয়ে বিজেপিকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল
১৭ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব ভোটেই মহিলা সমর্থনের সিংহভাগ পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপিও মহিলা ভোট পকেটে পুরতে তৃণমূল কংগ্রেসের দেড় হাজার টাকার পাল্টা ৩ হাজার টাকার অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে স্বপ্ন দেখিয়ে প্রচার করেছে । ২০২৬ এ মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৩ কোটি ৩৩ লক্ষ। আর ভোট দিয়েছেন ৩ কোটি ১০ লক্ষ। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৪৯ শতাংশ মহিলা ভোট। এই মহিলা ভোট যে দিকে তারই পাল্লাভারী। ২০২১ এ মহিলাদের ব্যাপক সমর্থন পেয়ে সরকার গড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে বছর মহিলা ভোটের হার ছিল ৮২.৩৫ শতাংশ আর ২৬ মহিলা ভোটের হার ৯৩.২৪ শতাংশ। অতএব হিসেব বলছে মহিলা ভোট অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের দিকেই ঝুঁকেছে।
আরেকাংশের দাবি,তৃণমূলের দুর্নীতিই হারের অন্যতম কারণ। রাস্তায় বসে শিক্ষকদের আন্দোল, আর সেই আন্দোলনে রাশ না টানা। আরজিকরের মতো আন্দোলন ও বিচার না হওয়া। কর্মসংস্থানে ব্যর্থতা। শিল্পসম্মেলন হলেও ভারী শিল্প না আসা। স্বজনপোষণ ও গনতান্ত্রিক পরিসরকে সঙ্কুচিত করা। শাসকের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই পুলিশ কেসের বহর। পুলিশকে ফ্রি হ্যান্ড কাজ করতে না দেওয়া। তোষণের রাজনীতি থেকে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকদের মতো দুর্নীতিতে নাম থাকা নেতাদের প্রার্থী করা। এই সমস্ত কারণ কোথাও গিয়ে তৃণমূলের হারের কারণ হিসাবে উঠে এসেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এখন দেখার বিজেপি সরকার গঠনের পর বাংলার মানুষের মননে যে ছবি তৈরি করেছে তার কতটা সফলতা পায়।