এর ফলে বিপদের মুখে পড়বেন শত শত ব্যবসায়ী, দাবি বিরোধীদের।
সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : এমন একটা শহর যেখানে গঙ্গার ঘাট, কাশী বিশ্বনাথ মন্দির আর হাজার বছরের ঐতিহ্য মিলে তৈরি করেছে এক অনন্য পরিচয়। সেই বারাণসীতেই এবার বড় সিদ্ধান্ত। শহরের ভিতর আর থাকবে না মাছ-মাংসের দোকান! প্রশাসনের দাবি, শহরকে আরও পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক করে তুলতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, এর ফলে বিপদের মুখে পড়বেন শত শত ব্যবসায়ী। বদলে যাবে কি মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা? কেন নেওয়া হল এই সিদ্ধান্ত, কারা এর পক্ষে আর কারা বিপক্ষে, এবং এর প্রভাবই বা কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে?

উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে বর্তমানে ৩৫০ থেকে ৪০০টি মাছ ও মাংসের দোকান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই শহরের বিভিন্ন বাজার এলাকায় এই দোকানগুলি ব্যবসা করে আসছে। সম্প্রতি মেয়র অশোক কুমার তিওয়ারির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বারাণসী পৌরনিগমের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, শহরের মূল অংশ থেকে মাছ ও মাংসের দোকান সরিয়ে শহরতলির নির্দিষ্ট এলাকায় স্থানান্তর করা হবে। পৌর কমিশনার হিমাংশু নাগপাল জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পাঁচটি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে- রামনগর, সুজাবাদ, গণেশপুর, অবলেশপুর এবং শিবপুর। এই এলাকাগুলিতে নতুন করে বাজার গড়ে তোলা হবে এবং ধাপে ধাপে বর্তমান দোকানগুলি সেখানে স্থানান্তরিত করা হবে।
প্রশাসনের বক্তব্য, এই সিদ্ধান্তের পিছনে প্রধান কারণ পরিচ্ছন্নতা এবং নগর ব্যবস্থাপনা। তাদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে মাছ ও মাংসের বাজার থাকায় দুর্গন্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং যানজটের সমস্যা তৈরি হয়। শহরের সৌন্দর্যায়ন এবং পর্যটন উন্নয়নের স্বার্থে এই বাজারগুলিকে শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে বারাণসীর চেহারা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। কাশী বিশ্বনাথ করিডর নির্মাণ, গঙ্গার ঘাট সংস্কার, পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়ন, নতুন রাস্তা ও নাগরিক পরিষেবা- সব মিলিয়ে শহরকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও বড় জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাংসদ কেন্দ্র হওয়ায় বারাণসীকে ঘিরে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, সেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতাতেই শহরের কেন্দ্র থেকে মাছ ও মাংসের বাজার সরানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। কংগ্রেস নেতাদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ সংবিধান প্রদত্ত জীবিকার অধিকারের পরিপন্থী। তাদের দাবি, শত শত ব্যবসায়ী এবং হাজার হাজার কর্মীর জীবিকা এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রভাবিত হতে পারে। জাতীয় কংগ্রেসের নেতা শাহনওয়াজ আলম বলেছেন, সম্মানের সঙ্গে জীবিকা অর্জনের অধিকার মৌলিক অধিকার। এই ধরনের সিদ্ধান্ত সেই অধিকারের উপর আঘাত হানতে পারে।
শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, উদ্বিগ্ন সাধারণ ক্রেতারাও। কারণ শহরের মূল অংশ থেকে দোকান সরিয়ে দিলে অনেক মানুষকে মাছ বা মাংস কিনতে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিক, নিম্নবিত্ত পরিবার এবং প্রতিদিনের বাজারের উপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে এটি বাড়তি অসুবিধার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বারাণসীর সঙ্গে বাঙালিদের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। সত্যজিৎ রায়ের ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে ফেলুদা বলেছিলেন, “বারাণসী বাঙালির সেকেন্ড হোম”। আজও বহু বাঙালি পরিবার সেখানে বসবাস করেন। বহু পর্যটক এবং তীর্থযাত্রী নিয়মিত শহরে যান। তাই শহর থেকে মাছের দোকান উঠে যাওয়ার খবর বাংলাতেও যথেষ্ট আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠছে। এটি কি শুধুই পরিচ্ছন্নতা ও নগর পরিকল্পনার অংশ? নাকি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক রয়েছে? সমালোচকদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শহরে মাংস বিক্রি নিয়ে বিধিনিষেধের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারেও শহরসীমার মধ্যে কাঁচা মাংস বিক্রি বন্ধ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। বকরি-ইদ উপলক্ষে বারাণসীর একটি পুরনো ছাগলের বাজারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বর্তমান সিদ্ধান্তকে অনেকেই বৃহত্তর একটি প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, এটি কোনও খাদ্যাভ্যাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়। মাছ ও মাংস বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হচ্ছে না। শুধু নির্দিষ্ট এবং পরিকল্পিত বাজার এলাকায় স্থানান্তর করা হচ্ছে, যাতে স্বাস্থ্যবিধি এবং নাগরিক পরিষেবা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাস্তবায়ন।
কবে থেকে শুরু হবে স্থানান্তর? ব্যবসায়ীদের কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প সুবিধা দেওয়া হবে? নতুন বাজারগুলিতে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো থাকবে কি না? ক্রেতাদের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন হবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। একদিকে পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত শহরের দাবি। অন্যদিকে ব্যবসা, খাদ্যাভ্যাস এবং সাধারণ মানুষের সুবিধার প্রশ্ন। বারাণসীর মাছ ও মাংসের দোকান স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এই দুইয়ের মাঝেই নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা কতটা তা মেনে নেন, সেটাই এখন দেখার।