উত্তরপ্রদেশে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে রেলস্টেশন, ট্রেন এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : সরকারি চাকরি মানেই নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রতিদিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যখন ৩২ হাজার ৬৭৯টি পদের জন্য আবেদন জমা পড়ে ২৯ লক্ষেরও বেশি, তখন সেই লড়াই কতটা কঠিন হতে পারে, তারই ছবি দেখা গেল উত্তরপ্রদেশে। পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে রেলস্টেশন, ট্রেন এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা। ভাইরাল হয়েছে একের পর এক ছবি ও ভিডিও। কোথাও ট্রেনের জানালা দিয়ে উঠে পড়ছেন পরীক্ষার্থীরা, কোথাও আবার স্টেশনের মেঝেতেই রাত কাটাতে হচ্ছে চাকরিপ্রার্থীদের। এই নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে উঠে এসেছে দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়েও এক বড় প্রশ্ন।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষাকে ঘিরেই নজিরবিহীন ভিড়। ৩২ হাজার ৬৭৯টি শূন্যপদের জন্য আবেদন করেছেন ২৯ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ একটি পদের জন্য লড়াই করছেন ৯০ জনেরও বেশি চাকরিপ্রার্থী। এই বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর চাপ সামলাতে কার্যত হিমশিম খেতে হয়েছে পরিবহণ ব্যবস্থাকে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষার্থীরা পৌঁছতে শুরু করেন নির্ধারিত কেন্দ্রে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে রেল পরিষেবার উপর। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রেনের ভেতরে পা রাখারও জায়গা নেই। বহু পরীক্ষার্থী জানালা দিয়ে কোচে ওঠার চেষ্টা করছেন। কোথাও দরজার সামনে ঝুলে রয়েছেন যাত্রীরা, আবার কোথাও কোচের মেঝেতে বসেই যাত্রা করছেন চাকরিপ্রার্থীরা।
শুধু ট্রেন নয়, রেলস্টেশনগুলির অবস্থাও ছিল একইরকম। লখনউয়ের চারবাগ স্টেশনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে রাত কাটাতে দেখা যায়। মেঝেতে বিছানা পেতে, ব্যাগকে বালিশ বানিয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় তাঁদের। অনেকের সঙ্গে ছিল না পর্যাপ্ত খাবার বা থাকার ব্যবস্থা। তবুও পরীক্ষার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি কেউ। চাকরির আশায় বহু কিলোমিটার দূর থেকে এসেছেন পরীক্ষার্থীরা। কারও বাড়ি পূর্বাঞ্চলে, কেউ এসেছেন পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ থেকে, আবার কেউ প্রতিবেশী রাজ্য থেকেও পরীক্ষায় অংশ নিতে পৌঁছেছেন। অনেকের মতে, এই পরীক্ষা শুধুমাত্র একটি চাকরির পরীক্ষা নয়, বরং পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ।
সরকারি চাকরির প্রতি এই আকর্ষণের পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। নিয়মিত বেতন, পেনশন সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা এবং চাকরির স্থায়িত্ব- সব মিলিয়ে এখনও দেশের কোটি কোটি তরুণের প্রথম পছন্দ সরকারি চাকরি। বিশেষ করে পুলিশ বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই আকর্ষণ আরও বেশি। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের কনস্টেবল পদে যোগ দিলে হাতে পাওয়া বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করে। তাই এই পরীক্ষাকে ঘিরে প্রতি বছরই ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। তবে এবারের ভিড় সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
পরীক্ষা উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলির বাইরে মোতায়েন করা হয়েছিল অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী। পরিবহণ ব্যবস্থাও কিছুটা বাড়ানো হয়েছিল। তবে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এতটাই বেশি ছিল যে অনেক জায়গাতেই সেই ব্যবস্থা পর্যাপ্ত বলে মনে হয়নি। এদিকে, ভাইরাল হওয়া ছবিগুলি নতুন করে সামনে এনেছে দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত অল্প সংখ্যক চাকরির জন্য কয়েক লক্ষ আবেদন জমা পড়া আসলে কর্মসংস্থানের চাহিদা এবং চাকরির ঘাটতিরই প্রতিফলন।
অনেক পরীক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ কোচিং করছেন, কেউ স্বশিক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিবারের সঞ্চয় খরচ করে, কখনও ধার করে পরীক্ষার ফি এবং যাতায়াতের খরচ জোগাড় করছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে একটি পরীক্ষা শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা নয়, বরং হাজার হাজার পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাই ট্রেনে ভিড়, স্টেশনে রাত কাটানো কিংবা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া- কোনও বাধাই তাঁদের দমাতে পারেনি।
তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়ও। যখন একটি রাজ্যে কয়েক হাজার চাকরির জন্য লক্ষ লক্ষ আবেদন জমা পড়ে, তখন তা কি শুধুই চাকরির জনপ্রিয়তা? নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বৃহত্তর কর্মসংস্থান সংকটের বার্তা? এই প্রশ্ন এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত যুবসমাজ। কিন্তু সেই তুলনায় চাকরির সুযোগ কি যথেষ্ট বাড়ছে? উত্তরপ্রদেশের এই নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সেই বিতর্ককেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ট্রেনের জানালায় ঝুলে থাকা তরুণ, স্টেশনের মেঝেতে রাত কাটানো পরীক্ষার্থী কিংবা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া হাজারো মুখ- সবকিছুই একটাই বার্তা দিচ্ছে। সরকারি চাকরির স্বপ্ন এখনও অটুট। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে প্রতিযোগিতা আজ অভূতপূর্ব। ৩২ হাজার চাকরির জন্য ২৯ লক্ষ আবেদন শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের কর্মসংস্থান বাস্তবতারও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার, এই বিপুল সংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে প্রশাসন এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নীতি।