“গৃহবধূরা শুধু হোমমেকার নন, বরং নেশন বিল্ডার অর্থাৎ একটা দেশ গড়ে তোলার পিছনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।”

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : তাঁরা বাড়ি থাকেন। দশভূজার মতো সংসারের সবদিক সামলান। যুগ আধুনিক হয়েছে। কিন্তু, কিছু বদ্ধ ধ্যানধারণায় এখনও জং পড়ে রয়েছে। এই যেমন সমাজ গৃহবধূদের এখনও মূল্য দিতে শেখেনি। তাঁদের কাজকে কাজ বলে মনেই করা হয় না। দিন-রাত পরিবারের জন্য খেটে চলেছেন, অথছ শুনতে হচ্ছে, সারাদিন তো ঘরেই বসে থাকে, কাজ আর কী। হাজার হাজার গৃহবধূদের প্রতিদিনই এমন কথা শুনতে হয়। এবার সেই গৃহবধুদের পরিশ্রম, সংসারের অবদানকে স্বীকৃতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। একটি মামলায় বৃহস্পতিবার দেশের শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, গৃহবধূরা শুধু হোমমেকার নন, বরং নেশন বিল্ডার অর্থাৎ একটা দেশ গড়ে তোলার পিছনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। একইসঙ্গে গৃহবধূদের শ্রমের মূল্য বুঝিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কোনও গৃহবধূর মৃত্যুর ফলে তাঁর পরিবারের যে ক্ষতি হয়, তা শুধুমাত্র মানসিক বা পারিবারিক নয়। তিনি যে দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজ, পরিচর্যা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতেন, তারও নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। আদালতের মতে, সেই পরিষেবার মূল্য মাসে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
কোন মামলার প্রেক্ষিতে দেশের শীর্ষ আদালতের এই মন্তব্য?
২০০১ সালের নভেম্বরে পঞ্জাবে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল এক বধূর। তাঁর মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মোটর অ্যাক্সিডেন্ট ক্লেম ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হয়েছিল পরিবার। প্রথমে ট্রাইবুনাল নিহত মহিলার পরিবারকে ২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
তবে সেই ক্ষতিপূরণের পরিমাণে সন্তুষ্ট ছিল না পরিবার। তারা পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। পরে হাইকোর্ট ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়িয়ে ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে পরিবার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায়। মামলার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে সুপ্রিম কোর্ট ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আদালত নির্দেশ দেয়, সংশ্লিষ্ট বিমা সংস্থাকে নিহত মহিলার পরিবারকে ৬২ লক্ষ ৭৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এই মামলার শুনানিতেই বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ গৃহবধূদের ভূমিকা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে। আদালতের মতে, সংসার সামলানো কোনও সাধারণ দায়িত্ব নয়। পরিবার গঠন, সন্তানদের প্রতিপালন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে গড়ে তোলা এবং পরিবারের ভিত মজবুত করার ক্ষেত্রে গৃহবধূদের অবদান অপরিসীম।
বিচারপতি করোল মন্তব্য করেন, গৃহবধূ শব্দটি তাঁদের অবদানের যথার্থ পরিচয় দেয় না। বরং তাঁদের দেশের নির্মাতা বলা বেশি উপযুক্ত। কারণ তাঁদের শ্রম এবং ত্যাগের উপরই বহু পরিবার এবং পরোক্ষে সমাজের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে।
বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে আদালত। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, বিয়ে কোনওভাবেই পরিচারিকা নিয়োগের সমার্থক নয়। সংসারের দায়িত্ব স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই। শুধুমাত্র বিবাহিত হওয়ার কারণে কোনও মহিলার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, পেশাগত স্বপ্ন বা উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে খর্ব করা যায় না।
আদালত আরও বলেছে, কোনও মহিলা সন্তান এবং পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি নিজের কর্মজীবনেও সফল হতে চাইলে, তা কখনও তাঁর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির প্রতি নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং সেটি তাঁর স্বাভাবিক অধিকার।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, অসংখ্য মহিলা এমন ত্যাগ স্বীকার করেন, যা সমাজের চোখে প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। তাঁরা নিজেদের সময়, শ্রম, দক্ষতা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবারের জন্য উৎসর্গ করেন। সেই শ্রমের ফলে পরিবারের আর্থিক উন্নয়নও সম্ভব হয়। তাই তাঁদের অবদানকে শুধুমাত্র আবেগের জায়গা থেকে নয়, অর্থনৈতিক মূল্য দিয়েও বিচার করা প্রয়োজন।
আদালত আরও উল্লেখ করেছে, দেশের কোটি কোটি গৃহবধূ বছরের পর বছর কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই পরিবারের জন্য কাজ করে চলেছেন। তাঁদের এই অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের দাবি। সেই কারণেই পারিবারিক সম্পত্তির ক্ষেত্রেও তাঁদের অধিকার নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করে সর্বোচ্চ আদালত।
সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট দেশের সব হাই কোর্টকে দুর্ঘটনার মামলায় নিহতদের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা করারও নির্দেশ দিয়েছে।