কোথায় গেলেন অরূপ বিশ্বাস ?

আদালতের নির্দেশ মেসিকাণ্ডে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাজিরা দিতে হবে!

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫। কলকাতায় লিওনেল মেসির সফর স্বপ্নের মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সফর পরিণত হয় এক চরম বিশৃঙ্খলার ঘটনায়। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল তারকার সামনে কলকাতার এই ছবি আন্তর্জাতিক মহলে শহরের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। লন্ডভন্ড হয়ে যায় কলকাতার বৃহত্তম ফুটবল স্টেডিয়াম যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। প্রিয় তারকাকে এক ঝলক দেখার আশায় আসা হাজার হাজার দর্শকের ক্ষোভ আছড়ে পড়ে স্টেডিয়ামে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে মাঝপথে গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। পরে এই ঘটনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও করতে হয় তাঁকে। এমন নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা হয়েছে কি না তা মনে করা কঠিন। সেইদিন মেসির সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার কথা ছিল অভিনেতা কিং খানেরও। কিন্তু তিনি হোটেল থেকেই ফিরে যান। এই অভিশপ্ত দিনটার কথা কলকাতাবাসী ভুলতে পারেনি আর পারবেও না। জেলে জেতে হয় শতদ্রু দত্তকে। এরপর জল অনেক দূর গড়িয়েছে।

এই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় রাজনৈতিক চাপানউতোর। মেসি-কাণ্ডে এবার পুলিশের নজরে রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। তাঁকে তৃতীয়বারের মতো নোটিস পাঠিয়েছে বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে থানায় হাজির হয়ে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে দুবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হলেও তিনি হাজিরা এড়িয়ে যান। অন্যদিকে অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাসকে তোলাবাজি, শ্লীলতাহানি-সহ একাধিক অভিযোগে আগেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মেসি কাণ্ডে অরূপ বিশ্বাস ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্ট থেকে রক্ষাকবচ পেয়েছেন। আদালত জানিয়েছে ১৭ অগাস্ট পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করা যাবে না। তবে তদন্তে সহযোগিতা করার শর্তও দেওয়া হয়েছে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, পুলিশ নোটিস দিলে তাঁকে হাজির হতে হবে এবং সেই নোটিস অন্তত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাজিরা দিতে হবে। পাশাপাশি আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়া যাবে না ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশ মেনেই পুলিশ এবার তাঁকে নতুন করে নোটিস পাঠিয়েছে। অভিযোগ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসির অনুষ্ঠানের সময় পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার অভাব ছিল। মেসিকে ঘিরে ছিলেন নেতা-মন্ত্রী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠরা। ফলে মাঠে উপস্থিত বহু দর্শক তাঁদের প্রিয় ফুটবল তারকাকে কাছ থেকে দেখতে পারেননি। অভিযোগ উঠেছে, মেসির সঙ্গে অরূপ বিশ্বাসের গায়ে পড়া নিয়েও। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন আর্জেন্তিনার এই মহাতারকা। অভিযোগকারী শতদ্রু দত্ত দাবি করেছেন, মেসির সফরের জন্য মোট ৭০ হাজার টিকিট তৈরি করা হয়েছিল। যার মধ্যে ২২ হাজার টিকিট অরূপ বিশ্বাস নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। এমনকি সেই টিকিট বিক্রির অভিযোগও সামনে এসেছে। এই বিষয়গুলি নিয়েই পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছে। প্রথমবার অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হাজিরা এড়ানোর পর তিনি গ্রেফতারির আশঙ্কায় আদালতের দ্বারস্থ হন। রক্ষাকবচ পাওয়ার পরও দ্বিতীয়বার হাজিরা না দেওয়ায় এখন তৃতীয় নোটিসের পর তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে।

লিওনেল মেসির মতো বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তির সফর কলকাতার জন্য গর্বের মুহূর্ত হতে পারত। কিন্তু ব্যবস্থাপনার অভাব, বিশৃঙ্খলা ও বিতর্কের কারণে সেই সুযোগ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসে কি না এবং এই ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় সেটাই দেখার। কারণ মেসিকাণ্ড শুধু একটি অনুষ্ঠানের ব্যর্থতা নয় এটি কলকাতার ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে।