বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের হয়ে ২০০ তম ম্যাচ খেলতে নেমে মেসি জানিয়ে দিলেন তাঁর পায়ের জাদু এখনও আগের মতোই অপ্রতিরোধ্য।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : HE IS UNREAL। আবারও প্রমাণিত। একটা গোটা জেনারেশন জানবে WHO IS THE REAL GOAT.কিছু খেলোয়াড় শুধু মাঠে নামেন আর কিছু খেলোয়াড় মাঠে নেমে ইতিহাস লিখে যান। লিওনেল মেসি আবারও দেখিয়ে দিলেন কেন তাঁর নাম ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় সবার আগে আসে। বয়স, চোট কিংবা সমালোচনা কোনও কিছুই থামাতে পারেনি এই ফুটবল জাদুকরকে। বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের হয়ে ২০০ তম ম্যাচ খেলতে নেমে মেসি জানিয়ে দিলেন তাঁর পায়ের জাদু এখনও আগের মতোই অপ্রতিরোধ্য।
চ্যাম্পিয়নের মতোই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল আর্জেন্তিনা। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন অধিনায়ক মেসি। মাত্র ৭৮ মিনিট মাঠে থেকেও করে ফেললেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক। প্রথম গোলটি ছিল তাঁর চেনা স্টাইলে। বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শট। এরপর দ্বিতীয় গোল এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তৃতীয় গোল করে আবারও মুগ্ধ করলেন গোটা ফুটবল বিশ্বকে। মেসি প্রথম ম্যাচেই বুঝিয়ে দিলেন আরও একবার চ্যাম্পিয়ন হতেই নেমেছেন তাঁরা। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছেন। মেসি আদৌ ভাল খেলতে পারবেন তো? কত ক্ষণ খেলতে পারবেন? বিশ্বকাপের আগে চোট পেয়েছিলেন। সেই চোট কতটা সেরেছে? এমনই বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছিল গত বারের বিশ্বজয়ী অধিনায়ককে নিয়ে। তিন শটে তার জবাব দিয়ে দিলেন তিনি। আপাতত চুপ করে যাবেন সমালোচকেরা। সমালোচকদের নীরব করে বুঝিয়ে দিলেন কিংবদন্তিদের জন্য বয়স শুধুই একটি সংখ্যা।
প্রশ্ন উঠেছিল মেসি কি শুরু থেকে খেলবেন? তার জবাব শুরুতেই দিয়ে দেন কোচ লিয়োনেল স্কালোনি। মেসিকে শুরু থেকেই নামিয়ে দেন তিনি। স্কালোনি চাইছিলেন শুরুতেই গোল তুলে নিতে। আর তার জন্য মেসির উপরেই ভরসা রাখেন তিনি। কোচকে হতাশ করেননি মেসি। শুরুর কয়েক মিনিট অবশ্য দুই দলের ডিফেন্ডারদের থেকেও বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছিল ভার প্রযুক্তির দায়িত্বে থাকা দলকে। ১০ মিনিটের মধ্যেই দুদল একবার করে গোল করে ফেলেছিল। আর্জেন্তিনার হয়ে বল জালে জড়ান মেসি। কিন্তু দুবার অফসাইডে গোল বাতিল হয়। শুরু থেকেই দুই দল মাঝমাঠের দখল নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আর্জেন্তিনা শক্তিশালী দল হলেও আর্জেন্তিনা প্রথম ১৫ মিনিট পুরোপুরি মাঝমাঠের দখল নিতে পারেনি। বেশ কয়েক বার তাদের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নেয় আলজেরিয়া। যদিও তারপর খেলায় ফেরে আর্জেন্তিনা। নেপথ্যে আর কেউ নন সেই মেসিই।
মেসিকে মার্ক করেননি আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচ। পাড়ার কোনও ক্লাবের কোচও এই করবেন না। অন্তত দুজনকে মেসির পিছনে রাখবেন। কিন্তু পেটকোভিচ কী পরিকল্পনা করেছিলেন তা তিনি নিজেই বলতে পারবেন। তার খেসারত দিতে হল আলজেরিয়াকে। আর্জেন্তিনাকে হারানোর স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে গেল তাদের। কারণ লিওনেল মেসি নামক এক অতিমানব। ১৭ মিনিটে ১-০ গোল করে আর্জেন্তিনা। প্রথম গোলের পর আর্জেন্তিনার খেলা বদলে যায়। বোঝা গেল বিশ্বচ্য়াম্পিয়ন হওয়ার চাপ মাঠের বাইরে ছুড়ে ফেলেছেন তাঁরা। উপভোগ করছেন। বেশিক্ষণ পায়ে বল রাখছিলেন না আর্জেন্তিনার ফুটবলাররা। বল পেলে সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থকে দিয়ে দিচ্ছিলেন। তাতে খেলার গতি বাড়ছিল। তবে পায়ে বল পেলে দেখা যাচ্ছিল মেসির সেই চেনা গতি। গোল খাওয়ার পর শোধ করার চেষ্টা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে আলজেরিয়া।
৫৫ মিনিটের মাথায় আক্রমণে জোড়া বদল করেন স্কালোনি। লাউতারো মার্তিনেজ ও থিয়াগো আলমাডার বদলে নিকোলাস গঞ্জালেজ ও ইউলিয়ান আলভারেজকে নামান তিনি। আর্জেনন্তিনার বাকি স্ট্রাইকারদের আটকাতে গিয়ে মেসিকে বারবার ছেড়ে দিচ্ছিলেন ডিফেন্ডারেরা। ৬০ মিনিটের মাথায় সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকারের ভূমিকায় দেখা গেল মেসিকে। যে আক্রমণ তৈরি হয়েছিল মেসির পায়ে তা শেষও হল মেসির পায়েই। বোঝাই যাচ্ছিল এবারের বিশ্বকাপও নিজের নামে করতে নেমেছেন মেসি। ৭৬ মিনিটেই হয়ে গেল তাঁর হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে প্রথম বার। মেসিকে থামাতে পারছিল না আলজেরিয়া। আরও একবার বক্সের বাইকে বেশ খানিকটা জায়গা পান তিনি। আর সেই সুযোগ ছাড়েননি লিও। আর সেই ভুলের খেসারত দিত হল আলজেরিয়াকে। বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ে নিখুঁত ফিনিশ মেসির। ৩-০ গোলে এগিয়ে গেল আর্জেন্তিনা। ফ্রান্সের খেলা না দেখে ছেলের খেলা দেখতে মাঠে ছিলেন জিদান। কয়েকটি ভাল সেভ করলেও বাবার সামনে ৩ গোল খেলেন ছেলে। এই অভিষেক ভুলতে চাইবেন লুকা।
তৃতীয় গোলের পরই তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। মেসিকে নিয়ে আর কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি স্কালোনি। তৃতীয় গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোজেকে ছুঁয়ে ফেললেন মেসি। দুজনেরই গোলের সংখ্যা ১৬। মেসির ফুটবল মস্তিষ্কের সামনে ব্যর্থ হল আলজেরিয়া। হ্যাটিকের পর মেসির চোখে জল। সমর্থকদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মত। রেকর্ডের থেকে বড় বিষয় হল মেসি এখনও কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণার নাম। শুরুতেই বলাম না HE IS UNREAL। এই কথাটাই যেন মেসির জন্যই তৈরি। একটি গোটা প্রজন্ম তাঁকে দেখে বড় হবে জানবে কেন ফুটবলের ইতিহাসে GOAT শব্দটির সঙ্গে লিওনেল মেসির নাম চিরকাল লেখা থাকবে। বিশ্বকাপের পথ এখনও অনেক বাকি কিন্তু প্রথম ম্যাচেই তিনি জানিয়ে দিলেন লিও শুধু খেলতে আসনি তিনি এসেছেন আবারও ইতিহাস তৈরি করতে। ২০০৬ থেকে ২০২৬। এটা নিয়ে ষষ্ঠবার তিনি ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপে খেলছেন। এখন তো সবে শুরু মেসি ম্যাজিক। এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি আছে। আরও কত ম্যাজিক দেখাবেন লিও তার অপেক্ষায় কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী।