“যে ভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাতে নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। কেন্দ্র বা রাজ্য, কেউ এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।”

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : সব মামলায় একই নির্দেশ নয়। সমস্যা যখন আলাদা, তেমনই সমাধানও আলাদা হওয়া উচিত। এই যুক্তি ধরেই বুধবার হকার উচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলাগুলির শুনানি হল কলকাতা হাইকোর্টে। কোনও মামলায় উচ্চ আদালত রেলের উচ্ছেদ সংক্রান্ত নোটিসে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। আবার কোনও ক্ষেত্রে উঠে এল পুনর্বাসনের প্রসঙ্গও।
যাদবপুর, মথুরাপুর, বালিগঞ্জ, ব্যান্ডেল-সহ রাজ্যের বিভিন্ন স্টেশনে হকার উচ্ছেদের নোটিসের উপরে আপাতত স্থগিতাদেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। বুধবার বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ৩০ জুন পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ থাকবে। মামলাগুলিকে দু ভাগে ভাগ করা হবে। প্রথম ভাগে থাকবে স্টেশন লাগোয়া নয়, রেলের এমন জমিতে যে সব বস্তি ও দখলদার আছে, তাদের মামলা। দ্বিতীয় ভাগে থাকবে স্টেশন এবং স্টেশন লাগোয়া জমিতে হকারদের মামলা। আগামী ২৪ জুন হকারদের মামলার শুনানি হবে এবং ২৫ জুন বস্তি ও অন্যান্য দখলদারদের মামলা শোনা হবে।
রেলের হকার উচ্ছেদের নোটিসকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া ২৫টি মামলার শুনানি হয় বুধবার। বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্য প্রতিটি মামলাই আলাদা করে শোনেন এবং প্রতিটির সমস্যা বুঝে সেই মতো নির্দেশ দিয়েছেন। দু’টি মামলায় রেলের মালিকানা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। আদালত বলেছে, রেলস্টেশন সংলগ্ন কিছু জায়গায় নোটিস দেওয়া হলেও, বাস্তবে সেই জমি রেলের কি না, প্রশ্ন আছে। বিচারপতির নির্দেশ, রেলকে নিজের জায়গা আগে চিহ্নিত করতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, মানচিত্র এক বিষয়, আর বাস্তবে সেই জায়গা রেলের কি না, সেটা আর এক বিষয়। যে জমিতে রেলের মালিকানা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, সেই জমি নিয়ে আগে রিপোর্ট দিতে হবে রেলকে।
আদালত জানিয়েছে, যে সব জায়গায় নোটিস দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোথাও বস্তি রয়েছে, কোথাও দোকান, আবার কোথাও বাজার। সব ক’টির সমস্যা পৃথক হওয়ায় তাই আপাতত আলাদা করেই সেই সব মামলা শোনা হবে। বুধবার দু’টি মামলায় বিচারপতির বক্তব্য, ওই সব জায়গায় একসময়ে রেলই বসার অনুমতি দিয়েছিল। পরে তা আর পুনর্নবীকরণ করা হয়নি ঠিকই। কিন্তু এখন উচ্ছেদের সময়ে বিকল্প জায়গার বিষয়টাও বিবেচনা করে আদালতে জানাতে হবে রেলকে।
শুনানিতে মামলাকারীদের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, যে ভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাতে নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। কেন্দ্র বা রাজ্য, কেউ এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। জীবনের অধিকার, কর্মসংস্থানের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সমাজের দুর্বল শ্রেণির মৌলিক অধিকার কোনও কারণ দেখিয়ে খর্ব করা যায় না। পাল্টা বিচারপতির প্রশ্ন, রেলের জায়গা, প্ল্যাটফর্ম যদি দখল করে দোকান বসে, তোলা হবে না? পরে নথি খতিয়ে দেখে জানা যায়, আদালত জানিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে রেল স্টল করে বসার ব্যবস্থা করেছিল। তাদের উচ্ছেদ করা হয়ে থাকলে তা-ও বিবেচনা করা হবে। লাইসেন্স আছে, এমন হকারদের তোলা হয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন বিচারপতি। বারুইপুরের ঘটনায় পরে নথি দেখে আদালত জানতে পারে, দু’জন হকারের লাইসেন্স ছিল। তাঁদের জন্য বিকল্প জায়গা নিয়ে কী করা হবে, সে ব্যাপারে রেলকে আদালতে জানাতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে,নির্বাচনী ভরাডুবির পর বুধবার প্রথম মিছিল করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মতলার লেনিন মূর্তি থেকে সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যার পর্যন্ত চলল মিছিল। পদযাত্রার শেষে একটি সভা করারও পরিকল্পনা ছিল বলে সূত্রের খবর। কিন্তু হল না। মিছিল শেষ করে গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেলেন মমতা।
ভোটে হারের পর থেকে কয়েক দফায় মমতা সোশ্যাল মিডিয়া সরাসরি সম্প্রচার করেছেন নিজের বার্তা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আক্রান্ত হওয়ার পরে গত ২ জুন ধর্নাতেও বসেছিলেন। সেখান থেকে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছিলেন। এ বার হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে মিছিল করলেন তৃণমূল নেত্রী। তবে হাতেগোনা কয়েক জনকে ছাড়া কোনও নেতা-কর্মীকে দেখা গেল না মমতার সঙ্গে হাঁটতে।
ক্ষমতাসীন মমতার পদযাত্রায় যে ধরনের ভিড় দেখা যেত, তা দৃশ্যত উধাও ছিল বুধবার। ভোটে ভরাডুবির পর থেকে তৃণমূলে অভূতপূর্ব ডামাডোল চলছে। বিধানসভার পরিষদীয় দল এবং লোকসভার সংসদীয় দলের বেশির ভাগই মমতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে। যে নেতানেত্রীরা এখনও মমতার অনুগত রয়েছেন, তাঁদেরও বেশির ভাগের দেখা মিলল না বুধবারের মিছিলে। মমতার সঙ্গে সামনের সারিতে হাঁটতে দেখা গেল কুণাল ঘোষ, দোলা সেনের মতো হাতেগোনা কয়েক জনকে।
রাজ্যে পালাবদলের পর থেকে সরকারি সম্পত্তি বেআইনি ভাবে দখলের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। জায়গায় জায়গায় বেআইনি হকারদের উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে বামপন্থী দলগুলি। পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রতিবাদ-কর্মসূচি চালাচ্ছে বামেরা। তৃণমূল নেত্রী মমতাও সোশ্যাল মিডিয়ায় হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। গত ২৬ মে, আন্তর্জাতিক হকার দিবসে এ নিয়ে দীর্ঘ পোস্ট করেন তিনি। অভিষেক আক্রান্ত হওয়ার পর ধর্না কর্মসূচি থেকেও এ নিয়ে সরব হন। তবে হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন বর্তমানে দৃশ্যত বামেদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। এ অবস্থায় উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে বুধবার রাস্তায় নামেন মমতা।
বুধবার তৃণমূল নেত্রী মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেখানে হকার উচ্ছেদের পাশাপাশি তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের উপর আক্রমণ এবং মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে গ্রেফতারির প্রসঙ্গও ছিল। মিছিল শুরুর আগে বুধবার দুপুরে দলীয় সূত্রে জানা যায়, লেনিন সরণি ধরে মিছিল যাবে সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যারে। সেখানে বিধান রায়ের বাড়ির উল্টোদিকে একটি সভা করার পরিকল্পনা ছিল তৃণমূলের। তবে শেষ পর্যন্ত মিছিলের পর আর কোনও বক্তৃতা করলেন না তৃণমূল নেত্রী।