পুলিশের জালে একের পর এক হেভিওয়েট !

একের পর এক দুর্নীতি, প্রতারণা, ত্রাণ আত্মসাৎ, কাটমানি ও হুমকির অভিযোগে আইনের জালে ধরা পড়ছেন প্রাক্তন মন্ত্রী-নেতারা।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একসময় রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাঁরা। মন্ত্রীত্বের দাপট, সাংগঠনিক প্রভাব আর রাজনৈতিক ক্ষমতা। সব মিলিয়ে তারাই ছিলেন তৃণমূল সরকারের মুখ। রাজ্যে পালাবদলের পর বদলে গিয়েছে ছবিটা। একের পর এক দুর্নীতি, প্রতারণা, ত্রাণ আত্মসাৎ, কাটমানি ও হুমকির অভিযোগে আইনের জালে ধরা পড়ছেন প্রাক্তন মন্ত্রী-নেতারা। এরই মাঝে থানায় হাজিরা দিতে বাধ্য হলেন বহুদিন প্রকাশ্যে না আসা আরেক প্রাক্তন মন্ত্রী । রাজ্যের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, তৃণমূলের একের পর এক প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি অভিযান।

বিধানসভা ভোটে কোচবিহারের দিনহাটায় তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। ভোটে হেরে যান। রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই এলাকায় তেমন দেখা যাচ্ছিল না । তৃণমূল আমলে যথেষ্ট দাপুটে নেতা ছিলেন উদয়ন গুহ। কোচবিহার জেলার সাংগঠনিক দায়িত্বেও ছিলেন। বহুবার বিভিন্ন কারণে সংবাদ শিরোনামে এসেছে উদয়ন গুহর নাম। তোলাবাজি, কাটমানি, ভোট পরবর্তী হিংসা, বিজেপি কর্মীদের ফাঁসানো। একাধিক সময়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। ভূরি ভূরি অভিযোগের শিরোনামে উদয়ন গুহর নাম। ভোটের পর থেকেই উদয়ন ফুলবাগানের ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করেন। এই তথ্য পাওয়ার পরেই গোপনীয়তা বজায় রেখে কলকাতায় এসে তৃণমূল নেতাকে গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশ। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা থেকে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগেই গ্রেফতার উদয়ন।

রাজ্যে পালা বদলের পর এই প্রথম নয়, এর আগে গ্রেফতার হন রাজ্যের আরও দুই প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু এবং উজ্জ্বল বিশ্বাস। গ্রেফতার হন তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলও। প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেফতার করা হয়েছিল প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুকে। পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁকে। রাজ্যে বিজেপি সরকার তৈরির পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক ছিল সেদিন। সেইদিন সুজিত বসুকে গ্রেফতার করে ইডি। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে দশটা। ছেলে সমুদ্র বসু ও আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে ইডি দফতরে হাজিরা দেন বিধাননগরের পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী সুজিত বসু। পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইডি দফতরে হাজিরা দেন প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। ১ মে প্রথমবার ইডি দফতরে হাজিরা দিয়েছিলেন তিনি। তাকে ফের তলব করা হয়। সেই তলবে হাজিরা এড়ান তিনি। ভোটের আগে পুর নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় ৪ বার নোটিস পেয়ে তিনি আসেননি। ভোট শেষের পর ১ মে হাইকোর্টের নির্দেশে ইডি দফতরে হাজিরা দেন বিধাননগরের তৃণমূল প্রার্থী সুজিত বসু। সেবারে প্রায় ৯ ঘণ্টা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ভোটের ফল প্রকাশের পর , ৬ মে তাঁকে ফের ইডি দফতরে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই তলবেও হাজিরা এড়ান সুজিত বসু। পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সিবিআই যে চার্জশিট দিয়েছিল, তার ১১ নম্বর পাতায় দাবি করা হয়, বেআইনিভাবে সবচেয়ে বেশি চাকরি দেওয়া হয় দক্ষিণ দমদম পুরসভায়। ২০১৪ সালের পর সেখানে ৩২৯ জনের নিয়োগ হয় টাকার বিনিময়ে। কেন্দ্রীয় এজেন্সি দাবি করে, করোনাকালে তৃণমূল পরিচালিত দক্ষিণ দমদম পুরসভায়, এভাবেই একসঙ্গে চাকরি হয়েছিল ২৯ জনের। এই পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন সুজিত বসু।

অবৈধভাবে ত্রাণ মজুতের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় রাজ্যের প্রাক্তন কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসকে। প্রাক্তন কারামন্ত্রীর গোডাউন থেকে প্রচুর ত্রাণ সামগ্রী একটা ট্রাকে লোড করার সময়, ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয়রা বাধা দেন। খবর দেওয়া পুলিশে। এরপরেই গ্রেফতার করা হয় রাজ্যের প্রাক্তন কারামন্ত্রীকে। কারামন্ত্রীর পর বিজ্ঞান প্রযুক্তি, জৈব ও প্রযুক্তি বিভাগের মন্ত্রীও ছিলেন উজ্জ্বল বিশ্বাস। নদিয়ার কৃষ্ণনগরে ত্রাণের ত্রিপল নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ গ্রেফতার প্রাক্তন কারা মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস। এদিনই ত্রাণ দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রীর বাড়িতে বিক্ষোভ দেখান বাসিন্দাদের একাংশ। গায়ে মুখে ছোড়া হয় ডিম। গ্রেফতারির আগে প্রবল ক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। সামনে দাঁড়িয়ে মুখে ছোড়া হয় ডিম। ত্রিপল চুরির অভিযোগে নদিয়ার কৃষ্ণনগরে ক্ষোভ আছড়ে পড়ে প্রাক্তন কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের বাড়িতে। ওঠে চোর স্লোগান। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকারি ত্রাণ মজুত করে রাখাছিল প্রাক্তন কারামন্ত্রীর বাড়িতে।

রাজ্যের তিন প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু এবং উজ্জ্বল বিশ্বাস, উদয়ন গুহের পাশাপাশি গ্রেফতারির তালিকায় রয়েছেন তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। ২৭ মে পুলিশের জালে ধরা পড়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। প্রথমে পুরীর এক হোটেল থেকে তাঁকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ এবং ডায়মন্ড হারবার পুলিশের যৌথ বাহিনী। পুলিশ আসার খবর পেয়েই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। তার পর থেকেই গা-ঢাকা দিয়েছিলেন দিলীপ। তাঁর খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি অভিযান শুরু করে পুলিশ। কিন্তু তিনি কোথায় আস্তানা গেড়েছেন, তার হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। পুরীর এক হোটেলে হানা দেয় এসটিএফ এবং ডায়মন্ড হারবার পুলিশ। হোটেলে গিয়ে রেজিস্টার ঘেঁটে তারা জানতে পারে, দিলীপ সেখানেই রয়েছেন। তার পরেই তাঁর ঘরে হানা দিয়ে দিলীপকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

অন্যদিকে অবশেষে দেখা মিলল রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের। ইতিমধ্যে তিনবার হাজিরা এড়িয়েছেন তিনি। তৈরি হচ্ছিল গ্রেপ্তারির আশঙ্কা। এই পরিস্থিতিতে অবশেষে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় হাজিরা অরূপ বিশ্বাসের। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে তিনি বিধাননগর দক্ষিণ থানায় পৌঁছন। গত ডিসেম্বর থেকে মেসি কাণ্ডে উত্তাল বাংলা। রাজ্যে পালাবদলের পরেই তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মামলা করেন মেসির ভারত সফরের উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত।

অরূপের হাজিরা প্রসঙ্গে ব্যঙ্গ করে পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, তিনি নাকি শুনেছেন, মেসির তরফ থেকে মেইল এসেছে থানায় যে ওই ঘটনায় মেসি কোন ভাবেই দায়ী নয়। অরূপ বিশ্বাস দায়ী। সুতরাং অরূপ বিশ্বাস এখন আন্তর্জাতিক ফিগার হয়ে গেলেন। বিদেশ থেকে আর্জেন্টিনা থেকে তার জন্য মেইল আসছে। অনেক গুরুত্ব বেড়ে গেছে।

রাজ্যে পালাবদলের পর একের পর এক তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধায়ক ও প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে আইনি জাল ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। সুজিত বসু, উজ্জ্বল বিশ্বাস, দিলীপ মণ্ডলের পর এবার গ্রেফতার উদয়ন গুহ। অন্যদিকে, গ্রেফতারির আশঙ্কার মাঝেই থানায় হাজিরা দিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ফলে রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন। আগামী দিনে তদন্তের জালে আর কারা পড়বেন?