আমেরিকা আর ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান জানাবে এবং কোনও পক্ষই অপর পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ১১০ দিন পর অবশেষে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটল। শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করল ইরান-আমেরিকা। ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের লড়াই শুরু হয়। পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে ইরান। পাল্টা ইরানের বন্দরগুলিতে অবরোধ শুরু করে আমেরিকা। তবে শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে অনুষ্ঠিত এক নৈশভোজে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর উপস্থিতিতে চুক্তিতে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে তাতে স্বাক্ষর করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। দুই দেশের মধ্যে এই প্রাথমিক চুক্তিতে সইয়ের পরেই ইরানি বন্দরগুলির ওপর যে অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে আমেরিকা।
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শের হওয়ার পর ভার্সাইয়ে অনুষ্ঠিক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করা হয়। চুক্তির কথা প্রকাশ্যে এনে ম্যাক্রো জানান, এটি পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। পুনরায় খুলবে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়লে সাধারণ মানুষের উপকার হবে।
চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক। আদতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শুক্রবার সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায় হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আগেই তা ফ্রান্সে হয়ে যায়। তেহরান জানিয়েছে, এই সংক্রান্ত নির্ধারিত যে বৈঠক জেনেভায় হওয়ার কথা ছিল, তা হবে।
চুক্তির শর্তগুলি কী কী?
লেবানন-সহ পশ্চিম এশিয়ার সব প্রান্তে দ্রুত পাকাপাকি ভাবে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে আমেরিকা, ইরান এবং তাদের সহযোগী রাষ্ট্রগুলি। আমেরিকা আর ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান জানাবে এবং কোনও পক্ষই অপর পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না। চূড়ান্ত চুক্তিস্বাক্ষরের আগে আমেরিকা এবং ইরান ৬০ দিন ধরে আলোচনা করবে। অমীমাংসিত বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হবে এই পর্বে। সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের পরেই হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। হরমুজ লাগোয়া ইরানের বন্দরগুলিতে আর কোনও বাধা সৃষ্টি করবে না আমেরিকা। সমঝোতাপত্রে থাকা শর্ত মেনে ইরান হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হবে। জাহাজগুলির কাছ থেকে কোনও রকম শুল্ক আদায় করবে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান পুনর্গঠনের জন্য ৩০ হাজার কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৬ লক্ষ কোটি টাকা) একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে আমেরিকা এবং সহযোগী দেশগুলি। ইরানের তেল এবং জ্বালানি দ্রব্যের উপর যাবতীয় বিধিনিষেধ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে আমেরিকা। পরমাণু অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তি অনুসারে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না-করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। ইরানের কাছে ইতিমধ্যেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, তা কী ভাবে ব্যবহৃত হবে, সেই বিষয়ে বোঝাপড়া করবে তেহরান এবং ওয়াশিংটন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আপাতত স্থিতাবস্থা বজায় রাখা হবে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার আগে আমেরিকা ইরানের উপর নতুন কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। ধাপে ধাপে বাজেয়াপ্ত সম্পদের একাংশ ইরানকে ফিরিয়ে দেবে আমেরিকা। সমঝোতাপত্রের শর্তগুলি মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে আমেরিকা এবং ইরানের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গঠিত একটি দল। যদিও সেই দল কী ভাবে কাজ করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরান-আমেরিকা শান্তি চুক্তি নিয়ে কী অবস্থান ইজরায়েলের?
সমঝোতা চুক্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বড় গুরুত্ব দিয়েছেন হরমুজ প্রণালী চালুর ওপর। সে অনুযায়ী সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কোনো টোল ছাড়াই ৬০ দিনের জন্য খুলে দিয়েছে ইরান। আর ইরানের বন্দরের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে তেহরান যে বিষয়টি নিয়ে বারবার সতর্ক করছে, তা হল লেবাননে ইজরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে।
এ নিয়ে ঘোরতর আপত্তি রয়েছে ইজরায়েলের। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প যেমন নভেম্বরের আগেই যুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছেন, তেমনই অক্টোবরে ইজরায়েলের সম্ভাব্য নির্বাচনের কথা ভেবে লেবাননে হামলা চালিয়ে যেতে চান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ ইজরায়েলি লেবাননে হামলা বন্ধ চান না।
লেবাননে হামলার কারণে নেতানিয়াহুর ওপর চটেছেন ট্রাম্পও। সম্প্রতি তাঁকে পাগল বলেছেন। তবে সেসবের তোয়াক্কা না করে বৃহস্পতিবার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইজরায়েলি বাহিনী। এতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া লেবাননের দক্ষিণে দখল করা অঞ্চলগুলো ছাড়বে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ইজরায়েল।
এর পাশাপাশি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার শান্তি চুক্তি নিয়ে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ ইজরায়েল। তাদের আপত্তির দিকগুলি হল-
ইজরায়েলকে অন্ধকারে রাখাঃ চুক্তিটির খসড়া বা মূল লিখিত নথি ইজরায়েলকে দেখতে দেওয়া হয়নি। তেল আবিবের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ করা হলেও আমেরিকা তা প্রত্যাখ্যান করায় দুই বন্ধু দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
চুক্তির শর্তে ইজরায়েলের অংশগ্রহণ না থাকা: ইজরায়েল এই শান্তি চুক্তির কোনও পক্ষ নয়। তা সত্ত্বেও চুক্তি অনুযায়ী লেবানন সীমান্তে যুদ্ধবিরতির বাধ্যবাধকতা আসায়, একে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর ও নিজেদের মতামতকে পাশ কাটানোর একটি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছে ইজরায়েলের রাজনৈতিক মহল।
ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ইজরায়েলের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো অক্ষত থেকে যাবে এবং তেহরান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মার্কিন তহবিল ও সম্পদ ফিরে পাবে, যা ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
লেবাননে অভিযান অব্যাহত রাখা: শান্তি চুক্তিতে লেবাননে সামরিক অভিযান কমানোর কথা থাকলেও ইজরায়েলের সাফ কথা—তারা এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে না।
ইরান আমেরিকা শান্তি চুক্তিতে বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানের গুরুত্ব কি বাড়ছে, ভারতেও বা কী প্রভাব পড়বে এই প্রশ্নগুলির ও বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক। আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তি ভারতেরও বড় প্রাপ্তি। কিন্তু সেই সুখবরেও খোঁচা হিসাবে থেকে গেল চুক্তিপত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় পাকিস্তানের স্বাক্ষর। যে চুক্তি গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এবং ভূকৌশলের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা নিতে পারে, তাতে পাকাপাকি ভাবে ইসলামাবাদের থেকে যাওয়াটা কূটনৈতিক ভাবমূর্তির প্রশ্নে সে দেশকে বাড়তি গুরুত্ব প্রদান করল, এমনই মত বিশেষজ্ঞদের। মুম্বই হামলা, পহেলগাঁও হামলার পর পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক স্তরে কোণঠাসা করেছিল ভারত, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে হল তার উল্টো। এই শান্তি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে এর অঙ্গ হিসাবে ইসলামাবাদ এমন সব আন্তর্জাতিক ছাড় পেতে শুরু করবে, অর্থনীতি এবং কৌশলগত ক্ষেত্রে যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রের মতে, এই চুক্তির ফলে ভারতের অশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা কমবে। তেল এবং গ্যাসের দাম কমতে পারে। টাকার ওপরে চাপ কমবে। মুদ্রাস্ফীতিতেও রাশ টানা হয়তো সম্ভব হবে। পাশাপাশি এমনটাও মনে করা হচ্ছে, এই যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার ওপরে জ্বালানি ক্ষেত্রে ভারতের অতিনির্ভরতাকেই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ৫০ শতাংশেরও বেশি অশোধিত তেল ভারত আমদানি করে এই অঞ্চল থেকে। এলপিজি-র ৭০ শতাংশ এবং প্রায় ৯০ শতাংশ এলএনজিও আমদানি করা হয়।