একে একে পুরনো সঙ্গী সাথীরা এভাবে তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গ ত্যাগ করায় এবার সত্যিই দল টিকিয়ে রাখা খুব শক্ত হয়ে যাবে না তো?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : আবারও তৃণমূলে শিবিরে আরও একটা উইকেট পড়ার মুখে। তবে কি এবার তৃণমূল সুপ্রিমোর মায়া ত্যাগ করে অন্য কারোর হাত ধরতে চাইছেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তাঁরও মনে জমেছে অভিমানের মেঘ। যার বহিঃপ্রকাশ করে ফেললেন দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে। কোথায় তাল কাটল। ছেলে তো আগেই মমতা বিরোধী শিবিরে নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। এবার কি মায়ের পালা। তবে কি এতদিন জল মাপছিলেন চন্দ্রিমা। অন্যদিকে একে একে পুরনো সঙ্গী সাথিরা এভাবে তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গ ত্যাগ করায় এবার সত্যিই দল টিকিয়ে রাখা খুব শক্ত হয়ে যাবে না তো। তৃণমূলের অন্দরে এখন সহজপাঠের ডাল খালির কবিতা উল্টো ভার্সন। কাল ছিল ডাল খালি নয়, এখন কাল ছিল ফুলে ভরে আর হল ডাল খালি। যারা এখনও দিদির হাত ধরে রয়েছেন তারাই যে কতদিন কে বলতে পারেন…..
তৃণমূলের রাজ্য সভাপতির পদ ছাড়লেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। চিঠি দিয়ে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি জানিয়েছেন, গত ৩ জুন যে পদে তাঁকে বসানো হয়েছিল, তা থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। তৃণমূল এবং তার বিভিন্ন শাখা সংগঠনের বিভিন্ন ব্যাঙ্কে যে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, সেই সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেনে তিনি আর সই করবেন না। নির্বাচন কমিশনে তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব ছিল তাঁর। সেই দায়িত্বও ছাড়লেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী। শনিবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি দিয়ে সমস্ত পদ ছাড়লেন চন্দ্রিমা। তিনি জানিয়েছেন কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ তাঁর নেই। কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাই ইস্তফা দিয়েছেন তিনি। ইস্তফা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই যে ছবির অপেক্ষা করছিল সকলে তা চাক্ষুস হল। বিধানসভায় দেখা গেল চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। আর তাঁকে গেট থেকে স্বাগত জানালেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। অতএব দুয়ে দুয়ে চার করতে আর কি অসুবিধা হওয়ার নয়। নব তৃণমূলের বৈঠকেও যোগ দেন মমতা দিদির গুড গার্ল চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সমীকরণ অনেক আগে থেকেই চলছিল। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন আরকি। না হলে কি আর দলের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সোজা নব তৃণমূলের বৈঠকে যোগ দিতে পারেন চন্দ্রিমা। তাঁর ছেলে সৌরভ বসু বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিতেই তৈরি হয়েছিল জল্পনা। প্রশ্ন উঠেছিল, পুত্র যেখানে বিরোধী শিবিরে নাম লিখিয়েছে, সেখানে মা মমতা-পন্থী তৃণমূল শিবিরে আর কত দিন? তার প্রমাণ মিলল শনিবার। অনেকেই বলছেন ছেলেকে আগে পাঠিয়ে জমি তৈরি করছিলেন।
মমতার মন্ত্রিসভায় নেত্রীর পরে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিলেন চন্দ্রিমা। অর্থ এবং স্বাস্থ্য রাজ্যের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দফতরে মমতা মন্ত্রী থাকলেও প্রতিমন্ত্রীর পদে ছিলেন চন্দ্রিমা। নেত্রীর ঘনিষ্ঠদের একাংশ বলে, চন্দ্রিমা ছাড়া সরকারে এত আস্থা আর কাউকে করেননি মমতা। সে কারণে কিছু নেতাদের আপত্তি সত্ত্বেও দলের ভাঙন পর্বে চন্দ্রিমাকেই রাজ্য সভাপতির পদে বেছে নিয়েছিলেন নেত্রী। শনিবার মমতাকে চিঠি লিখে সেই পদ থেকেই সরে দাঁড়ালেন চন্দ্রিমা। তিনি লিখেছেন, ৩ জুন কালীঘাটের বৈঠকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় রাজ্য সভাপতির যে পদে আমাকে বসানো হয়েছিল, তা থেকে ইস্তফা দিলাম। বর্তমানে আর যে যে পদে আমি রয়েছি, তা থেকেও ইস্তফা দিলাম। চন্দ্রিমার গলায় এদিন ধরে পড়ে অভিমান। কিন্তু অনেকের মতে যিনি সবসময় মমতার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিলেন তাঁরও আবার মনে ক্ষোভ জমেছিল। যে ক্ষোভের কারণেই তিনি প্রিয় দিদির হাত ছাড়তে বাধ্য হলেন আরকি। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের দাবি, তৃণমূল ভবনে গতকাল যা ঘটেছে সেটা নিয়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বললে উনি বলেন, ‘ভবনটা ওদের হাতে তুলে দিলে? একথাটাই নাকি মনে লেগেছে চন্দ্রিমার। তাঁর দাবি,তিনি কিছুই তুলে দেন নি। প্রতিদিন যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণই ছিলেন। তাঁর কাছে কেউ আসেনি। অথচ তাঁকেই বলা হল ওদের হাতে তুলে দিলে। আনুগত্য প্রশ্নের মুখে পড়ায় আর দিদির সঙ্গে থাকার ইচ্ছায় ইতি টেনেছেন চন্দ্রিমা।
কাকলি ঘোষদস্তিদার, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ রায়, শতাব্দী রায়, এক এক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছের মানুষরা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। দলের দুর্যোগকালে সবাই আশ্রয় নিয়েছেন নিরাপদ ছাতার নিচে। প্রতিদিনই নিঃসঙ্গ হচ্ছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। শেষ পর্যত্ন কাদের নিয়ে টিকে থাকার লড়াই লড়বেন নেত্রী। তাহলে শুধুমাত্র কর্মী আর যুব তৃণমূলই ভরসা। কিন্তু তাতেও তো সন্দেহের অবকাশ থাকছে না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি দলের নেতা, বিধায়কদের চাপ দেওয়া হচ্ছে। সেই কথা ধরে তো এই প্রসঙ্গ উঠবেই তৃণমূল কর্মীদের যারা খারাপ সময়ে লড়বেন তাঁদের নিরাপত্তা দেবে কে। সেটা যতদিন না নিশ্চিত হচ্ছে ততদিন এই ভাঙন রোগ নিরাময় করা যাবে না। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের দলের পদ ত্যাগ এই প্রশ্নকে আরও উস্কে দিয়েছে। পাশাপাশি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যর পদত্যাগপত্রের ভাষা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো চিঠিতে তাঁকে তৃণমূল চেয়ারপার্সন হিসেবে উল্লেখ করেননি চন্দ্রিমা। পরিবর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারলেও মানতে নারাজ তিনি প্রাক্তন। অথচ চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তাঁর পদত্যাগের চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে উল্লেখ করেছেন। অতএব অনেকেই বলছেন সময়ের স্বদব্যবহার বোধহয় একেই বলে।