কোথাও কোচ নিজেই দায়িত্ব নিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। আবার কোথাও ফুটবল ফেডারেশন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই তো চমক। এই মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোটি কোটি সমর্থকদের স্বপ্ন। খেলোয়াড়দের কঠোর পরিশ্রম ও কোচদের অসংখ্য পরিকল্পনা। প্রত্যাশা আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক তৈরি হলেই সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় দলের প্রধান কোচকেই। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগেই একাধিক দেশ ব্যর্থতার দায়ে তাদের কোচকে হারিয়েছে। কোথাও কোচ নিজেই দায়িত্ব নিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। আবার কোথাও ফুটবল ফেডারেশন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্যর্থতার পর একের পর এক কোচের বিদায় এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কোন কোন দেশের কোচ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর দায়িত্ব ছেড়েছেন।

১. জুলিয়ান নাগেলসম্যান (জার্মানি)
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি ছিল জার্মানির অকাল বিদায়। রাউন্ড অফ ৩২-এ প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে নাটকীয় হারের পরই বিদায় নেয় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে টানা তিনটি বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি জার্মানি। ২০১৮ ও ২০২২ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে গিয়েছিল তারা। এবার নকআউটে উঠলেও শেষ পর্যন্ত হতাশাই সঙ্গী হয়। এই ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে প্রধান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান পদত্যাগ করেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ২০২৮ ইউরো পর্যন্ত চুক্তি ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনার পর তিন সরে দাঁড়ান। বিদায়ের আগে নাগেলসম্যান বলেন, প্যারাগুয়ের কাছে হারা দল কখনও বিশ্বের সেরা হতে পারে না। এই পারফরম্যান্স আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। নাগেলসম্যানের উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে লিভারপুলের সাবেক কোচ যুর্গেন ক্লপের নাম। যদিও এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি তবে জার্মান ফুটবলের নতুন অধ্যায়ে ক্লপকে দেখতে আগ্রহী সমর্থক ও ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।

২. রোনাল্ড কোম্যান (নেদারল্যান্ডস)
বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের অভিযানও শেষ হয় রাউন্ড অফ ৩২-এ। মরক্কোর বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেওয়ার পর প্রধান কোচ রোনাল্ড কোম্যান নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেন। দ্বিতীয়বার জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে তিনি নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখলেও তা পূরণ হয়নি। ইনস্টাগ্রাম আবেগঘন বার্তায় কোম্যান লেখেন, বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এই ব্যর্থতার দায় আমার। তাই নেদারল্যান্ডসের প্রধান কোচের দায়িত্ব শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিশ্বকাপে তাঁর কৌশল নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। গ্রুপ পর্বে আক্রমণাত্মক ৪-৩-৩ ফর্মেশন ব্যবহার করলেও মরক্কোর বিরুদ্ধে হঠাৎ ৫-২-৩ রক্ষণাত্মক ছক বেছে নেওয়ার সমর্থক ও বিশষজ্ঞদের প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। কিংবদন্তি জলাতান ইব্রাহিমোভিচ পর্যন্ত মন্তব্য করেন, ডাচ দলকে ভীতু মনে হয়েছে। এটা ডাচ ফুটবলের পরিচয় নয়। তবে কোম্যান নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, দলকে ভয় পেয়ে নয় বরং বলের দখল বাড়ানোর লক্ষ্যেই ওই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিদায়ের পর আর্নে স্লটের নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে উঠে এসেছে।

৩. হং মিয়ুং বো (দক্ষিণ কোরিয়া)
দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম কিংবদন্তি ফুটবলার হং মিয়ুং বো কোচ হিসেবে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে বিদায় নেয় এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দলটি। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর তিনি ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ গড়তে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

৪. মিরোস্লাভ চৌবেক (চেকিয়া)
চেকিয়ার জন্যও ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল হতাশার। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি ড্র করতে সক্ষম হয় দলটি। খারাপ ফলাফলের পাশাপাশি কোচকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত মিরোস্লাভ চৌবেক দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, আমাকে নিয়ে অনেক ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোচ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কোনও অর্থ নেই।

৫. সাবরি লামুশি (তিউনিশিয়া)
বিশ্বকাপের সবচেয়ে দ্রুত কোচ পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে তিউনিশিয়া শিবিরে। প্রথম ম্যাচেই সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পরই প্রধান কোচ সাবরি লামুশিকে বরখাস্ত করা হয়। মাত্র কয়েক মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া এই ফরাসি কোচ বিশ্বকাপে মাত্র একটি ম্যাচ পরিচালনা করেই বিদায় নেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত দ্রুত কোচ অপসারণের ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

৬. মার্সেলো বিয়েলসা (উরুগুয়ে)
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম অভিজ্ঞ ও সম্মানিত কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে উরুগুয়ের কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু দলটি গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি। টুর্নামেন্ট শেষে বিয়েলসা নিজেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল এনে দিতে না পারার দায় তাঁরই।

৭. স্টিভ ক্লার্ক (স্কটল্যান্ড)
প্রায় তিন দশক পর বিশ্বকাপে ফিরে এসেও স্কটল্যান্ড গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে ব্যর্থ হয়। এরপরই প্রধান কোচ স্টিভ ক্লার্ক দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি স্কটল্যান্ডকে একাধিক বড় টুর্নামেন্ট পৌঁছে দেন এবং জাতীয় দলের ইতিহাসে অন্যতম সফল কোচ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর তিনিও বিদায় নেন।

৮. সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে (ইকুয়েডর)
রাউন্ড অফ ৩২-এ মেক্সিকোর কাছে ২-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ইকুয়েডর। ম্যাচের পরই প্রধান কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে পদত্যাগ করেন। বিদায়ী বার্তায় তিনি বলেন, আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছিলাম তা পূরণ করতে পারিনি। সেই ব্যর্থতার দায় আমি নিচ্ছি।
বিশ্বকাপ এখনও শেষ হয়নি। সামনে রয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের মতো মহাকরণ। ফলে টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোর পর আরও কোচের বিদায় দেখতে পাওয়া যায় কি না সেটাই এখন দেখার। ফুটবলে সাফল্য যেমন একজন কোচকে নায়ক বানায় তেমনি ব্যর্থতা মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে তাঁর ভবিষ্যৎ। আপনাদের কী মনে হয়। এই কোচদের মধ্যে কার পদত্যাগ সবচেয়ে অবাক করেছে?