ধর্ষণ ও খুনকাণ্ডে সুবিচারের দাবিতে ফুঁসছে জনতা, কড়া নিরাপত্তায় এলাকায়।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের সূর্যপুরে ১২ বছরের এক নাবালিকার অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গোটা এলাকা। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, রাজনৈতিক তৎপরতা এবং প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে কার্যত থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বারুইপুর, নরেন্দ্রপুর ও সোনারপুর থানা এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাতে কোনও ধরনের বেআইনি জমায়েত, বিক্ষোভ বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেই কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের নাম দিবাকর সরদার ও প্রভাস মণ্ডল। পাশাপাশি আরও তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে কোনও ফাঁক রাখা হবে না বলেই জানিয়েছে পুলিশ।

রবিবার ধৃত দিবাকর সরদার ও প্রভাস মণ্ডলকে মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। অভিযুক্তদের হাসপাতালে আনার সময় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। হাসপাতাল চত্বর এবং আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, তার জন্য বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়।
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় এখনও প্রবল উত্তেজনা বিরাজ করছে। রবিবার সকাল থেকেই সূর্যপুর ও সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় চলছে পুলিশি টহল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কোনও রকম ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে না।
নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এদিন বারুইপুরে পৌঁছায় সিপিএমের একটি প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সুজন চক্রবর্তী, শমিক লাহিড়ী-সহ দলের অন্যান্য নেতারা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তাঁরা। একই সঙ্গে ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।
অন্যদিকে, এলাকাবাসীর ক্ষোভ এখনও প্রশমিত হয়নি। তাঁদের একটাই দাবি— প্রকৃত দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বহু মানুষের হাতে দেখা গিয়েছে “জাস্টিস ফর বারুইপুর” লেখা পোস্টার। এলাকাবাসীর বক্তব্য, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোখা কঠিন হবে।
তদন্তে গতি আনতে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে পুলিশ। এই তদন্তকারী দলে রয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত, বারুইপুরের এসডিপিও অভিষেক রঞ্জন, কোর্ট অফিসার জয়ন্ত দাস, রনি সরকার, বারুইপুর এসওজির সৌমেন দাস, বারুইপুর থানার আইসি জয়ন্ত পোদ্দার এবং তদন্তকারী অফিসার দিগন্ত মণ্ডল। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, নাবালিকাকে যখন পুকুরের জলে ফেলা হয়, তখন সে জীবিত ছিল বলে ইঙ্গিত মিলেছে। রিপোর্টে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্নের উল্লেখ রয়েছে। মাথার পিছনে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও যৌনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন এবং শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ মিলেছে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে এই তথ্যগুলি এখনও প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা গিয়েছে। চূড়ান্ত ফরেন্সিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
তদন্তকারী আধিকারিকরা জানিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ফরেন্সিক রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বারুইপুরের এই ঘটনায় গোটা রাজ্য জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যেমন বেড়েছে, তেমনই দ্রুত বিচার এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিও জোরালো হয়েছে। আপাতত কড়া পুলিশি নজরদারির মধ্যেই তদন্ত এগোচ্ছে। প্রশাসনের দাবি, আইন মেনেই সমস্ত পদক্ষেপ করা হচ্ছে এবং তদন্তের স্বার্থে কোনও গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষা করা হবে না। এখন সকলের নজর পুলিশের তদন্ত, চূড়ান্ত ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়ার দিকে।