ব্রহ্মোসে আগ্রহী ইন্দোনেশিয়া।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : তিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরের প্রথম পর্বে ইন্দোনেশিয়ায় গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। জাকার্তায় তাঁকে স্বাগত জানান ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো। বিমানবন্দরে ছিল গার্ড অব অনার, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিশেষ অভ্যর্থনা। তবে এই সফর শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়। প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি- এই ছয়টি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে ভারতের এই সফর। কেন ইন্দোনেশিয়া এখন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার? কেন নিকেল ও বিরল খনিজ নিয়ে এত আলোচনা? ব্রহ্মোস ও অ্যাস্ট্রা ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আর কীভাবে এই সফর ভারতের Act East Policy ও MAHASAGAR Vision-কে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে?
৬ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত সরকারি সফরে ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এটি তাঁর তিন-দেশ সফরের প্রথম ধাপ। ইন্দোনেশিয়ার পর তিনি অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড সফরে যাবেন। জাকার্তায় পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো। ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান প্রধানমন্ত্রীর বিমানকে দেশটির আকাশসীমায় এসকর্ট করে নিয়ে আসে, যা বিশেষ কূটনৈতিক সম্মানের প্রতীক।

২০১৮ সালে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্ক Comprehensive Strategic Partnership-এ উন্নীত হয়। তারপর এটাই প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর। দুই দেশের লক্ষ্য- কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যৌথভাবে কাজ করা। এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি বিষয় প্রতিরক্ষা। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে ইতিমধ্যেই যৌথ সামরিক মহড়া, উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা বৈঠক এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা রয়েছে। এবার সেই সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা চলছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া ভারতের তৈরি Astra আকাশ-থেকে-আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহে আগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

ব্রহ্মোস বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের আন্তর্জাতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা সহযোগিতাও নতুন মাত্রা পাবে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়া ভারত মহাসাগর এবং মালাক্কা প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই প্রেক্ষাপটে সাবং বন্দর বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। এই বন্দরের উন্নয়ন ও ব্যবহার নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে, ভারতের সামুদ্রিক যোগাযোগ, বাণিজ্যিক রুট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরের আগে বলেছেন, এই সফর ভারতের MAHASAGAR Vision-কে এগিয়ে নিয়ে যাবে। MAHASAGAR-এর পূর্ণরূপ- Mutual and Holistic Advancement for Security Across the Regions. এর মূল লক্ষ্য- ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা, সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ভারতের Act East Policy-র উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা। ইন্দোনেশিয়া এই নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই এই সফরকে কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, ভারতের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সৌরশক্তি এবং উন্নত প্রযুক্তি শিল্পে নিকেল, বক্সাইট, তামা এবং বিরল খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বের মোট নিকেল মজুতের প্রায় ২১ শতাংশ রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। তাই ভারতের উৎপাদন ও সবুজ জ্বালানি পরিকল্পনার জন্য ইন্দোনেশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রযুক্তি সহযোগিতাও আলোচনার অন্যতম বিষয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের নির্বাচন পরিচালনার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইন্দোনেশিয়ার জন্য বিশেষ ইভিএম প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা সিদ্ধান্তের জন্য দুই দেশের সরকারি ঘোষণার দিকেই নজর থাকবে।
আসিয়ান দেশগুলির মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে ১৩০টিরও বেশি ভারতীয় সংস্থা ইন্দোনেশিয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছে। নতুন বিনিয়োগ, পরিকাঠামো, শক্তি এবং শিল্প সহযোগিতা নিয়েও এই সফরে আলোচনা হচ্ছে। কূটনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সম্পর্কও এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট প্রবোও প্রাম্বানান মন্দির পরিদর্শন করবেন। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত এই মন্দির ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার প্রাচীন সাংস্কৃতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রতীক। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। ইন্দোনেশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যাবেন অস্ট্রেলিয়ায়। তারপর সফরের শেষ ধাপে যাবেন নিউজিল্যান্ডে। এই তিন দেশের সফরের মাধ্যমে ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক, কৌশলগত, এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইন্দোনেশিয়া সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়, বরং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ সহযোগিতা আরও গভীর করতে আগ্রহী। আগামী দিনে এই সফর থেকে কী কী আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা ঘোষণা সামনে আসে, সেদিকেই নজর থাকবে। কারণ এই সিদ্ধান্তগুলি শুধু ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্ক নয়, গোটা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।