তাজমহল কি হিন্দু মন্দির? আসল সত্য কী?

কেন্দ্রীয় সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া-র কাছে জবাব তলব করল এলাহাবাদ হাইকোর্ট।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : তাজমহল কি সত্যিই একদা ছিল তেজো মহালয়া নামের এক শিবমন্দির? বহু পুরনো এই প্রশ্ন নতুন করে উসকে দিল এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিত রঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ। আর হাইকোর্টের এই প্রশ্ন ওঠার পরই দেশজুড়ে এখন চর্চার বিষয় তাজমহল আর তেজো মহালয়া। ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপত্য, বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য- তাজমহল। দীর্ঘদিন ধরেই এই স্মৃতিসৌধকে ঘিরে নানা বিতর্ক রয়েছে। এবার সেই বিতর্কে নতুন মোড় এনে এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া-র কাছে জবাব তলব করেছে। আবেদনকারীদের দাবি, তাজমহল আসলে মোগল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত সমাধিসৌধ নয়, বরং এটি ছিল ‘তেজো মহালয়’ নামে একটি প্রাচীন শিব মন্দির। সেই দাবি প্রমাণ করতে তাঁরা আদালতের তত্ত্বাবধানে স্মৃতিসৌধে জরিপ, ছবি তোলা এবং ভিডিওগ্রাফির অনুমতি চেয়েছেন। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি- এগুলি আবেদনকারীদের দাবি মাত্র। আদালত এখনও এই দাবির সত্যতা সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি। বর্তমানে হাইকোর্ট শুধু কেন্দ্র ও ASI-এর মতামত চেয়েছে।

এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি রিভিশন পিটিশনের শুনানিতে বিচারপতি রোহিত রঞ্জন আগরওয়াল কেন্দ্রীয় সরকার এবং ASI-কে নোটিস জারি করেছেন। আদালত জানতে চেয়েছে, আবেদনকারীরা যে জরিপের দাবি তুলেছেন, তা কেন করা যাবে না? এই প্রশ্নেরই জবাব দিতে হবে কেন্দ্র ও ASI-কে। এই আবেদন করেছেন আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন-সহ কয়েকজন আবেদনকারী। মামলাটি দায়ের করা হয়েছে ‘লর্ড শ্রী অগ্রেশ্বর মহাদেব নাগনাথেশ্বর বিরাজমান’-এর নামে, একজন ‘নেক্সট ফ্রেন্ড’-এর মাধ্যমে। আবেদনকারীদের দাবি, তাজমহলকে হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা করা হোক এবং সেখানে হিন্দুদের পুজোর অনুমতি দেওয়া হোক।

আবেদনকারীদের বক্তব্য, তাজমহল মূলত ‘তেজো মহালয়’ নামে একটি প্রাচীন শিব মন্দির ছিল। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, পরবর্তীকালে মোগল আমলে এই স্থাপত্যের রূপ পরিবর্তন করা হয় এবং এটি মমতাজ মহলের সমাধিসৌধে রূপান্তরিত হয়। এই দাবির সত্যতা আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি এবং ASI-ও আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি সমর্থন করেনি। আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, তাজমহলের স্থাপত্যে বহু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাঁদের মতে হিন্দু মন্দিরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁরা উল্লেখ করেছেন- গম্বুজের চূড়া, পদ্মের নকশা, এবং এএসআই-এর নথিতে ‘গোশালা’ হিসেবে উল্লেখ থাকা একটি কাঠামোর কথা। তাঁদের মতে, এসব বিষয় বিস্তারিত জরিপের মাধ্যমে পরীক্ষা করা উচিত।

কেন জরিপের দাবি? আবেদনকারীদের বক্তব্য, তাজমহলের কিছু অংশ সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ। তাই স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ বা ছবি তোলা সম্ভব নয়। এই কারণেই আদালতের তত্ত্বাবধানে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করে পরিদর্শন, ফটোগ্রাফি এবং ভিডিওগ্রাফির অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এই আবেদন প্রথম নয়। ২০১৫ সালেও আগ্রার একটি আদালতে একই ধরনের মামলা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে নিম্ন আদালত জরিপের আবেদন খারিজ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, আবেদনকারীরা পর্যাপ্ত নথি জমা দিতে পারেননি। জমির বর্ণনাতেও অসঙ্গতি ছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও আগ্রার অতিরিক্ত জেলা বিচারক একই আবেদন খারিজ করেন। এরপর আবেদনকারীরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।

বর্তমানে হাইকোর্ট কোনও রায় দেয়নি। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার এবং ASI-এর কাছে তাদের অবস্থান জানাতে বলেছে। নোটিস জারির প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ASI। তাজমহলও তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা একটি সংরক্ষিত স্মৃতিসৌধ। এই মামলায় ASI-এর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। তারা আদালতে কী ব্যাখ্যা দেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।

তাজমহলের ইতিহাস কী বলে? ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত তথ্য অনুযায়ী, তাজমহল নির্মাণের নির্দেশ দেন মোগল সম্রাট শাহজাহান। তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহল-এর স্মৃতিতে এই সমাধিসৌধ নির্মিত হয়। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৬৩২ সালে এবং কয়েক দশক ধরে তা সম্পন্ন হয়। তাজমহল বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য এবং বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।

এই মামলার গুরুত্ব শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে ঘিরে নয়। এখানে উঠে এসেছে- ইতিহাসের ব্যাখ্যা, ধর্মীয় অধিকার, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং আদালতের ভূমিকা। তাই এই মামলার প্রতিটি পদক্ষেপই দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এখন কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআই আদালতে তাদের হলফনামা জমা দেবে। তারপর আদালত শুনানি চালিয়ে যাবে। আদালত চাইলে জরিপের আবেদন মঞ্জুর করতে পারে, আবার খারিজও করতে পারে। সবকিছুই আদালতের পরবর্তী নির্দেশের উপর নির্ভর করছে।

সব মিলিয়ে, তাজমহলকে ঘিরে বহুদিনের বিতর্কে নতুন আইনি অধ্যায় শুরু হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- আদালত এখনও তাজমহলকে মন্দির বলে ঘোষণা করেনি এবং আবেদনকারীদের দাবিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এলাহাবাদ হাইকোর্ট শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার ও ASI-এর কাছ থেকে তাদের মতামত চেয়েছে। তাই এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব দাবি আদালতের বিচারাধীন। আগামী শুনানিতে কেন্দ্র ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কী অবস্থান জানায় এবং আদালত কী নির্দেশ দেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।