বারুইপুরে ফের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু, নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে কড়া বার্তা দিলেন।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : বারুইপুরে নাবালিকাকে নৃশংস নির্যাতন ও খুনের ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। গোটা এলাকা এখনও থমথমে। এমন পরিস্থিতিতেই মঙ্গলবারের পর শনিবার ফের বারুইপুরে পৌঁছলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, গণপিটুনিতে নিহত ‘নির্দোষ’ ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের বাড়িতেও যান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর পরিবারের জন্য একাধিক সরকারি সহায়তার ঘোষণা করেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপের আশ্বাস দেন।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ বারুইপুরের সূর্যপুরে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমেই তিনি নির্যাতিতা কিশোরীর বাড়িতে যান। প্রায় দশ মিনিট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। তাঁদের মানসিকভাবে শক্ত থাকার পরামর্শ দেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “প্রথম দিন থেকেই পরিবার আমাদের কথা শুনেছে এবং তদন্তে সাহায্য করেছে। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। মঙ্গলবার এখানে এসে পরিবারের কাছ থেকে যে চারজনের নাম জানতে পেরেছিলাম, পুলিশ ইতিমধ্যেই তাদের গ্রেপ্তার করেছে। ডিজিপির তত্ত্বাবধানে পুলিশ ও এসটিএফ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত করেছে।”
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, নাবালিকার নির্যাতন ও খুন এবং পরবর্তী সময়ে গণপিটুনিতে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনা— এই দু’টি মামলাকেই সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তাঁর কথায়, “দুই মামলাতেই কাস্টডি ট্রায়াল হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে এমন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। গোটা বিষয়টি আমি নিজে মনিটর করব। সরকারের দায়িত্ব ছিল পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। কীভাবে সাহায্য করেছি, তা আমি বলব না। সময়মতো পরিবারই সব জানাবে।”

এরপর মুখ্যমন্ত্রী যান গণপিটুনিতে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের বাড়িতে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। ইন্দ্রজিতের বাবার জন্য বার্ধক্যভাতা এবং মায়ের জন্য অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা চালু করার কথা ঘোষণা করেন। পাশাপাশি, আগেই দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইন্দ্রজিতের দাদার হাতে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরির নিয়োগপত্রও তুলে দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যুর প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি জানান, নির্যাতিতার বাবা-মা তদন্তকারীদের কাছে যে চারজনের নাম বলেছিলেন, সেখানে কোথাও ইন্দ্রজিতের নাম ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এটি নিছক জনরোষ নয়, বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
তিনি বলেন, “ইন্দ্রজিতের নাম-পরিচয় সব জেনে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। যারা ভোটে হেরে এলাকায় হিংসা ছড়িয়েছে, মানুষকে উসকানি দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন নিজের পথে চলবে এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
এদিন বারুইপুরের সাধারণ মানুষের উদ্দেশেও আশ্বাসের বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “যারা এলাকায় হিংসার আগুন জ্বালিয়েছে, রেললাইন উপড়েছে, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করেছে, এবার তারাই ভয় পাবে। সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করুন। আপনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের।”
আইনশৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করতে শনিবারই সূর্যপুরে নতুন পুলিশ ফাঁড়ির উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। নির্যাতিতার পরিবারের দাবি মেনে মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই এই পুলিশ ফাঁড়ি তৈরি করে চালু করা হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই ফাঁড়ি চালু হওয়ার ফলে এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি ও নজরদারি আরও বাড়বে। অপরাধ দমনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও আরও জোরদার হবে।
বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনা শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগনা নয়, গোটা রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি, একের পর এক গ্রেপ্তারি, নতুন পুলিশ ফাঁড়ি চালু এবং ক্ষতিগ্রস্ত দুই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা— সব মিলিয়ে শনিবারের মুখ্যমন্ত্রীর সফর প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকেই আরও স্পষ্ট করে দিল। এখন নজর আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া এবং তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ের দিকে। রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা, নির্যাতিতা কিশোরী এবং গণপিটুনিতে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবার— উভয়েই দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে এবং দোষীরা আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হবে।