মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন ১৩ মৎস্যজীবী, সহকর্মীদের তৎপরতায় বড়সড় বিপদ এড়াল বঙ্গোপসাগর।

।বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : কয়েকদিন আগেই বঙ্গোপসাগরে ট্রলার দুর্ঘটনায় একাধিক মৎস্যজীবীর মৃত্যুর ঘটনায় শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল উপকূল। সেই আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই ফের সমুদ্রে বড় দুর্ঘটনা। তবে এবার ভাগ্য সহায় ছিল। কাকদ্বীপের ‘এফবি সিদ্ধিবিনায়ক’ নামে একটি মাছ ধরার ট্রলার গভীর সমুদ্রে ডুবে গেলেও অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেন ট্রলারে থাকা ১৩ জন মৎস্যজীবী। বিপদের মুহূর্তে পাশ দিয়ে যাওয়া অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলারের দ্রুত তৎপরতাতেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন তাঁরা।স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, কাকদ্বীপের বাসিন্দা লক্ষ্মীনারায়ণ দাসের মালিকানাধীন ‘এফবি সিদ্ধিবিনায়ক’ ট্রলারটি কয়েকদিন আগে ১৩ জন মৎস্যজীবীকে নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। নির্ধারিত সময়ে মাছ ধরা শেষ করে ট্রলারটি উপকূলের দিকে ফিরছিল। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বকখালি উপকূল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পৌঁছতেই আচমকা আবহাওয়ার অবনতি হয়। মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল হয়ে ওঠে বঙ্গোপসাগর।মৎস্যজীবীদের দাবি, প্রথমে প্রবল দমকা হাওয়া শুরু হয়। তারপর একের পর এক বিশাল ঢেউ ট্রলারের গায়ে আছড়ে পড়তে থাকে। উত্তাল সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করে ট্রলারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালান মাঝি ও কর্মীরা। কিন্তু প্রকাণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় ট্রলারের নিচের অংশে ফাটল ধরে যায়। সেই ফাটল দিয়ে দ্রুত জল ঢুকতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে ডুবতে শুরু করে।বিপদ বুঝতে পেরে ট্রলারে থাকা ১৩ জন মৎস্যজীবী প্রাণ বাঁচানোর জন্য চিৎকার শুরু করেন। রাতের অন্ধকারে তাঁদের আর্তনাদ শুনে কাছাকাছি মাছ ধরছিল অন্য একটি ট্রলারের মৎস্যজীবীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। কোনও সময় নষ্ট না করে তাঁরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। উত্তাল সমুদ্রের মধ্যেই একে একে সকলকে ডুবন্ত ট্রলার থেকে নিরাপদে নিজেদের ট্রলারে তুলে নেওয়া হয়।স্থানীয়দের বক্তব্য, উদ্ধারকাজে সামান্য দেরি হলেও বড়সড় প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। কারণ তখন ট্রলারটির অধিকাংশই জলের নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। সহকর্মী মৎস্যজীবীদের উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতার ফলেই বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।যদিও ১৩ জন মৎস্যজীবী প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তবে ‘এফবি সিদ্ধিবিনায়ক’ ট্রলারটিকে আর রক্ষা করা যায়নি। সেটি সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রের জলে তলিয়ে যায়। ট্রলারটির সঙ্গে মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম, জাল, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীও ডুবে গিয়েছে। ফলে মালিকের বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া মৎস্যজীবীদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁদের শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলেই জানা গিয়েছে। এরপর তাঁদের নিরাপদে উপকূলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।কাকদ্বীপ ট্রলার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বিজন মাইতি জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ট্রলারে থাকা ১৩ জন মৎস্যজীবীকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর উপকূলে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। তবে ট্রলারটি এখনও উদ্ধার করা যায়নি এবং সেটি সমুদ্রের তলায় ডুবে রয়েছে।এই ঘটনায় উপকূল জুড়ে ফের উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কয়েকদিন আগেই বঙ্গোপসাগরে একাধিক ট্রলার দুর্ঘটনায় বহু মৎস্যজীবী প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনার রেশ কাটার আগেই ফের একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ায় মৎস্যজীবীদের পরিবারগুলির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার খবর পৌঁছতেই কাকদ্বীপ ও আশপাশের এলাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ১৩ জনই নিরাপদে উদ্ধার হয়েছেন বলে খবর পৌঁছাতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তাঁরা।মৎস্যজীবীদের একাংশের দাবি, বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে আবহাওয়া অত্যন্ত দ্রুত বদলে যায়। অনেক সময় পূর্বাভাসের বাইরে গিয়েও কয়েক মিনিটের মধ্যে সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে। ফলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারগুলির জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং আবহাওয়ার নিয়মিত আপডেট আরও জোরদার করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও গোটা ঘটনার উপর নজর রাখা হচ্ছে। ডুবে যাওয়া ট্রলারটি উদ্ধারের সম্ভাবনা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর, ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরেও একজন মৎস্যজীবীরও প্রাণহানি ঘটেনি। সহকর্মীদের দ্রুত তৎপরতা এবং ভাগ্যের জোরেই এ যাত্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন ১৩ জন মৎস্যজীবী। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বুকে ফের ট্রলার দুর্ঘটনার এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিল, প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়, আর সমুদ্রে জীবিকার সন্ধানে নামা প্রতিটি যাত্রাই কতটা অনিশ্চয়তার।