সেদিনের অনভিজ্ঞ কোচের হাতে ইতিহাস!

খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিলেন যে এই মানুষটিই একদিন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা কোচ হিসেবে নিজের নাম লিখবেন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার জন্য হতাশার প্রতীক ছিল। প্রতিভাবান ফুটবলারদের সমন্বয়ে গড়া দলটি দিশেহারা, পরিকল্পনাহীন এবং আত্মবিশ্বাসহীন ছিল। সেই সময়ই অনেককে বিস্মিত করে এক অনভিজ্ঞ কোচের হাতে জাতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় — লিওনেল স্কালোনি। তখন খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিলেন যে এই মানুষটিই একদিন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা কোচ হিসেবে নিজের নাম লিখবেন।

স্কালোনির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব শুধু ট্রফি জেতা নয় ; বরং তিনি একটি ভেঙে পড়া দলকে নতুন পরিচয় দিয়েছেন। তিনি এমন একটি দল গড়েছেন, যেখানে লিওনেল মেসিকে একা সব দায়িত্ব বহন করতে হয় না। বরং পুরো দল এমনভাবে গড়ে উঠেছে যাতে মেসি নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেন, আর বাকিরা নিজেদের ভূমিকা নিখুঁতভাবে পালন করেন। ফলে আর্জেন্টিনা আর ❝ মেসির দল ❞ নয়, বরং ❝ একটি পূর্ণাঙ্গ দল ❞ হয়ে উঠেছে।

এই পরিবর্তনের ফলাফল মাঠে এবং ট্রফির ক্যাবিনেটে ফুটে উঠেছে :

২০১৯ কোপা আমেরিকা – সেমিফাইনাল

২০২১ কোপা আমেরিকা – চ্যাম্পিয়ন

২০২২ ফিনালিসিমা – চ্যাম্পিয়ন

২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ – চ্যাম্পিয়ন

২০২৪ কোপা আমেরিকা – চ্যাম্পিয়ন

২০২৬ বিশ্বকাপ – ফাইনাল ( এবং যাত্রা অব্যাহত )

টানা পাঁচটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেই সেমিফাইনালে পৌঁছানো, চারটি বড় শিরোপা জয় এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া … এগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি একটি যুগের নাম। এটি আর্জেন্টিনা ফুটবলের স্বর্ণযুগ।

বিশ্বকাপের মঞ্চেও স্কালোনির পরিসংখ্যান বিস্ময়কর। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচে কোচিং করিয়েছেন। ১৪ টি ম্যাচে ১১ টি জয়, মাত্র একটি হার, ৮৩.৩ শতাংশ জয়ের হার, ৩৪ টি গোল, মাত্র ১৫ টি গোল হজম এবং পাঁচটি ক্লিন শিট … এই সংখ্যাগুলো শুধু সাফল্যের নয়, ধারাবাহিক আধিপত্যেরও প্রমাণ।

তবে স্কালোনির প্রকৃত শক্তি সংখ্যার চেয়েও বড়। তিনি অসাধারণ একজন ম্যাচ রিডার। ম্যাচের গতি কোন দিকে যাচ্ছে, কোথায় পরিবর্তন দরকার, কোন খেলোয়াড়কে কখন নামাতে হবে … এসব বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা।

অতিরিক্ত এরিয়াল থ্রেট তৈরির জন্য নিকোলাস গনসালেসকে নামানো, ডান দিক থেকে আরও কার্যকর ক্রসের জন্য রদ্রিগো ডি পলকে এগিয়ে আনা, মেসির পাশে শক্তি ও গতি যোগ করতে গনসালো মন্তিয়েলকে ব্যবহার করা, প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে নিকোলাস ওতামেন্দিকে নামানো কিংবা বক্সের ভেতরে আরও কার্যকর উপস্থিতির জন্য জুলিয়ান আলভারেজের পরিবর্তে লাউতারো মার্তিনেজকে ব্যবহার করা … প্রতিটি বদল ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে। তাঁর বদলি খেলোয়াড়রা শুধু মাঠে নামেননি ; তারা ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেছেন।

২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০৩ টি ম্যাচে ৮০ টি জয়, ১৪ টি ড্র এবং মাত্র ৯ টি হার … এই রেকর্ড প্রমাণ করে যে স্কালোনির সাফল্য কোনো ক্ষণস্থায়ী বিস্ময় নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সঠিক দর্শন, অসাধারণ ম্যান – ম্যানেজমেন্ট এবং ট্যাকটিক্যাল দক্ষতার ফল।

অনেকেই এই দলকে ❝ লা স্কালোনেতা ❞ বলে ডাকেন। কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল একটি ডাকনাম নয় ; এটি এমন একটি দর্শনের প্রতীক, যেখানে দল ব্যক্তির চেয়ে বড়, পরিশ্রম প্রতিভাকে পরিপূর্ণতা দেয় এবং সঠিক নেতৃত্ব একটি জাতিকে আবার বিশ্বসেরার আসনে ফিরিয়ে আনতে পারে।

লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনাকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন লিওনেল স্কালোনি। একজন মাঠে জাদু দেখিয়েছেন, আর অন্যজন সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সেই জাদুর জন্য নিখুঁত মঞ্চ তৈরি করেছেন।

তাই আজ আর প্রশ্ন নয়, বরং স্বীকৃতির সময়।
লিওনেল স্কালোনি শুধু আর্জেন্টিনার একজন সফল কোচ নন ; তিনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং অনেকের চোখে নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা কোচ।