তথ্যগত গড়মিল রুখতে যাচাই অভিযান

জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্রের নথি খতিয়ে দেখতে ডায়মন্ড হারবার পুরসভায় পুলিশের তল্লাশি, রেজিস্টার ও তথ্যভান্ডার পরীক্ষা

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র সংক্রান্ত সরকারি নথি ও রেজিস্টার খতিয়ে দেখতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার পুরসভায় তল্লাশি চালাল ডায়মন্ড হারবার থানার পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশ আধিকারিকদের একটি দল পুরসভার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখায় পৌঁছে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন নথিপত্র, রেজিস্টার এবং তথ্যভান্ডার পরীক্ষা করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরসভা চত্বরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রশাসনিক মহল থেকে রাজনৈতিক মহল—সব ক্ষেত্রেই শুরু হয় জোর আলোচনা।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পৌর এলাকার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সরকারি নথিতে কোনও অসঙ্গতি, তথ্যগত গরমিল বা অনিয়ম রয়েছে কি না, তা যাচাই করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তদন্তকারী আধিকারিকরা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মূল রেজিস্টার, আবেদনপত্র, শংসাপত্র ইস্যুর নথি, সংশ্লিষ্ট রেকর্ড এবং ডিজিটাল তথ্যভান্ডার খতিয়ে দেখেন। পাশাপাশি দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন।

প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এই অভিযান কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে এই তল্লাশি চালানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিভিন্ন নথির যথার্থতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশাসন একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই ডায়মন্ড হারবার পুরসভার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখার নথিপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।

তদন্তকারী আধিকারিকরা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখছেন, রেজিস্টারে সংরক্ষিত তথ্য এবং সরকারি তথ্যভান্ডারে থাকা তথ্যের মধ্যে কোনও অমিল রয়েছে কি না। জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যুর ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি নিয়ম মেনে সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অতীতের নথিও যাচাই করা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।

এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। ডায়মন্ড হারবার বিজেপি সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক অতনু সাঁতরা বলেন, “এসআইআর (SIR)-এর জন্য যে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্যই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজ্যের মুখ্য সচিবের নির্দেশে এই প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তে যদি কোনও গড়মিল বা অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তাহলে তা অবশ্যই সামনে আসবে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তাঁর বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত ডায়মন্ড হারবার পুরসভার পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। পুরসভার কোনও আধিকারিক প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি। অন্যদিকে, পুলিশও তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে রাজি নয়। তবে তদন্তকারী সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, সমস্ত নথি যাচাইয়ের কাজ চলছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হবে না।

সূত্রের খবর, তল্লাশির সময় একাধিক বছরের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্টার পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কিছু নথির অনুলিপিও সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা। ডিজিটাল রেকর্ড এবং ম্যানুয়াল রেজিস্টারের তথ্যের মধ্যে কোনও পার্থক্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও নথি সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও জানা গিয়েছে।

জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট, আধার, ভোটার তালিকা, সম্পত্তি সংক্রান্ত নথি, উত্তরাধিকার এবং বিভিন্ন সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে এই শংসাপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে এই ধরনের নথিতে কোনও ধরনের তথ্যগত অসঙ্গতি থাকলে তা প্রশাসনিক ও আইনি—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই কারণেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত চালানো হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।

এই তল্লাশি অভিযানের পর ডায়মন্ড হারবার পুরসভা এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, তদন্তে আদৌ কোনও অনিয়ম সামনে আসে কি না। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এটি একটি চলমান তদন্ত এবং সমস্ত তথ্য ও নথি খতিয়ে দেখার পরই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

বর্তমানে তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ সমস্ত নথি, রেজিস্টার এবং তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখছে। কোথাও কোনও গরমিল, জালিয়াতি বা নিয়মভঙ্গের প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপাতত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতির দিকেই নজর প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।