সুন্দরবনে বাঘের সামনে প্লাস্টিকের বোতল!

পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, আগামী দিনে যদি বাঘের পেটেও এই প্লাস্টিক চলে যায়, তবে বাঘের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সামনে একটি প্লাস্টিকের পানীয়ের বোতল ভাসতে বা পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্রে প্লাস্টিক দূষণের এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগের।

মানুষ ও পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য এখন সুন্দরবনের গহীন অভয়ারণ্য এবং ব্যাঘ্র প্রকল্পের গভীরেও পৌঁছে গেছে। বাঘ বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী কৌতূহলবশত প্লাস্টিক চিবোতে গেলে তা তাদের পরিপাকতন্ত্রে আটকে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।
বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: নদীতে প্লাস্টিক জমার ফলে তা জলজ প্রাণী এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের শ্বাসমূলের মারাত্মক ক্ষতি করছে। ​সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মতো বিপন্ন প্রজাতিকে বাঁচাতে জঙ্গলের মধ্যে প্লাস্টিক ফেলা পুরোপুরি বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকদের ক্যামেরা তাক করা হচ্ছে বাঘেদের উপর। বাঘের এক ঝলক ক্যামেরায় তুলে ধরার জন্য নদীর একেবারে ধার ঘেঁষে যাচ্ছে নৌকা। অনেকেরই তো সে ভাগ্য হয় না। এসব পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বাঘের কাছে পৌঁছে গিয়েই তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে দিচ্ছে।

সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে, দোবাঁকি ক্যাম্প থেকে কিছুটা দূরে গভীর ম্যানগ্রোভের অরণ্যে এক অভূতপূর্ব ও উদ্বেগজনক দৃশ্য দেখা গেল। প্লাস্টিকের বোতল দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। ভারত তথা বাংলার মানুষের কাছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সবসময়ই এক গর্বের বিষয়। বর্তমানে সুন্দরবনে প্রায় ১০৫ থেকে ১১০ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। কিন্তু তাদের বাসস্থান এখন চরম সঙ্কটে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সুন্দরবনে মৃত ডলফিন, কচ্ছপ এবং কুমিরের পেটে ম্যাক্রো ও মাইক্রো প্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, আগামী দিনে যদি বাঘের পেটেও এই প্লাস্টিক চলে যায়, তবে বাঘের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
গোসাবা বিডিও অফিস থেকে মাত্র ১ কিলোমিটারের মধ্যে, গোসাবা বাজার সংলগ্ন বিদ্যাধরী নদীতে ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে লক্ষ লক্ষ প্লাস্টিক ও আবর্জনা ভাসছে। জোয়ার এবং ভাঁটার টানে এই প্লাস্টিকই প্রতিনিয়ত পৌঁছে যাচ্ছে সুন্দরবনের গভীর থেকে গভীরতর জঙ্গলে।

যা কার্যত সুন্দরবনের গোটা বাস্তুতন্ত্রকে কার্যত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্লাস্টিক যেমন বন্যপ্রাণের পেটে যাচ্ছে, ঠিক তেমনই তা নদীর মাছের পেটে ঢুকে শেষমেশ মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। এখানেই শেষ নয়, প্লাস্টিক ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলে আটকে গিয়ে ছোট ছোট ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১০ বছর ধরে এভাবেই নদীতে প্লাস্টিক ভেসে বেড়াচ্ছে। তৃণমূলের জমানায় বর্জ্য পদার্থের কোনও সঠিক ব্যবস্থাপনা বা তার বাস্তবায়ন করা হয়নি। অন্যদিকে, বোট মালিকদের অভিযোগ, বোট থেকে নদীতে প্লাস্টিক বোতল ফেলা হলে মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা দিতে হয়। পর্যটক পিছু প্রায় ৫০০০ টাকা পর্যন্ত এবং সেই সঙ্গে বোটের বিএলসি (BLC) ধরে জরিমানা করা হয়। এক বোট মালিক শুভজিৎ সর্দার বলছেন, “আমাদের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকে। যাতে পর্যটকরা জলে কিছু না ফেলেন। ফেললেই ফাইন হয়।”