কলকাতায় ফিরে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে তসলিমা নাসরিন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় ফিরে আবারও নিজের পুরনো অবস্থান স্পষ্ট করলেন নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। মঙ্গলবার পানিহাটিতে বিশিষ্ট বাঙালি নারীবাদী চিন্তাবিদ ও লেখিকা বেগম রোকেয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি)-র পক্ষে সওয়াল করলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত আইন ধর্মের ভিত্তিতে নয়, তৈরি হওয়া উচিত সমান অধিকার ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে।
তসলিমার কথায়, ‘‘ধর্মীয় আইন থাকলে মহিলারা সমান অধিকার পাবেন না। তাই সমান অধিকারের ভিত্তিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা উচিত।’’ তাঁর দাবি, শুধু মুসলিম মহিলারাই নন, ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের কারণে বাংলাদেশে হিন্দু মহিলারাও উত্তরাধিকার-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। ইউসিসি চালু হলে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব বলেই মনে করেন তিনি।
তসলিমার যুক্তি, বিশ্বের বহু উন্নত দেশে আইন ধর্মনিরপেক্ষ এবং ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আইনও সমান অধিকারকে কেন্দ্র করেই তৈরি। তাই ধর্মের ভিত্তিতে আইন না করে মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষপাতী তিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন তসলিমা। গণতন্ত্রে তাঁর আস্থার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামি লিগের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। শেখ হাসিনার দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিত। আমি চাই শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন।’’
তবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঘোর বিরোধিতা করেছেন তসলিমা। তাঁর অভিযোগ, ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মহিলাদের অধিকার খর্ব করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দলটি শরিয়তি আইন এবং মহিলাবিরোধী নীতির পক্ষে। ফলে জামায়াতের রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা জারি হলে তাঁর আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, এই ধরনের রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এলে সংখ্যালঘু এবং মহিলাদের অধিকার আরও সংকুচিত হবে।
বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা এখনও রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তসলিমা। ‘‘সব সময়ই দেশে ফেরার পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু আমাকে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না,’’ বলেন তিনি।

বেগম রোকেয়ার সমাধিতে গিয়ে তাঁর নারীশিক্ষা ও মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলনের কথাও স্মরণ করেন তসলিমা। রোকেয়াকে নারীশিক্ষা ও সমানাধিকারের সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৯৪ সাল থেকে নির্বাসনে থাকা তসলিমা ২০০৭ সালে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর লেখা ‘দ্বিখণ্ডিত’ ঘিরে তীব্র প্রতিবাদের পর দীর্ঘ সময় শহরের বাইরে ছিলেন তিনি। প্রায় ১৯ বছর পরে কলকাতায় তাঁর এই প্রত্যাবর্তন তাই আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। এ দিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারও আগামী অগস্টের বিধানসভা অধিবেশনে ইউসিসি বিল আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত ন’সদস্যের কমিটি ইতিমধ্যে খসড়া বিধি চূড়ান্ত করার কাজ করছে।