বাজারের হিসেব বলছে, একসময় যে পেট্রোল গাড়ি ছিল ভারতের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি, তার আধিপত্য এখন ধীরে ধীরে কমছে।

আর প্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একটা সময় ছিল, গাড়ি কিনবেন মানেই প্রথম প্রশ্ন- পেট্রোল, না ডিজেল? কিন্তু এখন সেই প্রশ্নটাই বদলে যাচ্ছে। গাড়ি কিনতে গিয়ে মানুষ ভাবছেন- CNG নেব? হাইব্রিড নেব? নাকি ইলেকট্রিক? আর এই বদলে যাওয়া বাজারের মাঝেই একটা বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে- ভারতে কি পেট্রোল গাড়ির জনপ্রিয়তার দিন শেষ হতে শুরু করেছে? না, এখনও পেট্রোল গাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু বাজারের হিসেব বলছে, একসময় যে পেট্রোল গাড়ি ছিল ভারতের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি, তার আধিপত্য এখন ধীরে ধীরে কমছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে শুধুমাত্র পেট্রোলে চলা গাড়ির অংশ প্রায় ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, নতুন গাড়ি কেনার সময় ক্রেতাদের একটা বড় অংশ এখন বিকল্প জ্বালানির দিকে তাকাচ্ছেন। আর এই পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ।
প্রথম কারণ- E20 পেট্রোল
ভারতে ধীরে ধীরে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল বা E20-এর ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের যুক্তি, ইথানল মিশ্রণ বাড়লে অপরিশোধিত তেলের আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে এবং পরিবেশের উপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু গাড়ির মালিকদের একটা অংশের মনে তৈরি হয়েছে অন্য প্রশ্ন। E20 ব্যবহার করলে গাড়ির মাইলেজ কি কমবে? পুরনো গাড়ির ইঞ্জিন বা ফুয়েল সিস্টেমে কি সমস্যা হতে পারে? দীর্ঘদিন ব্যবহারের পরে খরচ কি বাড়বে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর নিয়ে বাজারে এখনও যথেষ্ট আলোচনা এবং বিভ্রান্তি রয়েছে।
ইথানলের শক্তি প্রতি লিটারে পেট্রোলের তুলনায় কম। তাই E20 ব্যবহারে কিছু গাড়িতে মাইলেজ সামান্য কমতে পারে। বিভিন্ন হিসেব অনুযায়ী, পরিস্থিতি ও গাড়ির মডেলের উপর নির্ভর করে এই প্রভাব কয়েক শতাংশ হতে পারে। তবে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি- E20 মানেই সব গাড়ির জন্য বিপজ্জনক- এমন কথা ঠিক নয়। নতুন প্রজন্মের অনেক গাড়িই E20 জ্বালানির উপযোগী করে তৈরি হচ্ছে। সমস্যার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি পুরনো গাড়িগুলিকে নিয়ে। বিশেষ করে যেসব গাড়ির ফুয়েল সিস্টেমের কিছু উপাদান উচ্চমাত্রার ইথানল মিশ্রণের জন্য তৈরি নয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে রাবার, গ্যাসকেট বা অন্যান্য উপাদানের ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকতে পারে। অর্থাৎ, গাড়ি পুরনো হলেই যে সমস্যা হবেই, তা নয়। আবার সব পুরনো গাড়ি একইভাবে E20 সামলাবে- এমন নিশ্চয়তাও নেই।
এখানেই ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। আর এই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি বিষয়- মাইলেজ। ভারতে একটা গাড়ি কেনার সময় শুধু গাড়ির দাম নয়, তার মাসিক চালানোর খরচও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করেন, তাঁর কাছে প্রতি লিটারে কয়েক কিলোমিটার বেশি বা কম মাইলেজও বছরে বড় অঙ্কের পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সেখানেই CNG গাড়ি অনেক ক্রেতাকে আকর্ষণ করছে। CNG-র জ্বালানি খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিদিনের যাতায়াতের ক্ষেত্রে অনেকের কাছে এটি বেশি সাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। তার উপর দেশের বিভিন্ন শহরে CNG পরিকাঠামোও বাড়ছে। ফলে যে ক্রেতা আগে শুধুই পেট্রোল গাড়ি বিবেচনা করতেন, তিনি এখন CNG-ও হিসেবের মধ্যে রাখছেন। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। কারণ বাজারে ঢুকে পড়েছে আরও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী- হাইব্রিড।
হাইব্রিড গাড়িতে পেট্রোল ইঞ্জিনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটর কাজ করে। ফলে শহরের ট্রাফিকে অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচ কমানো সম্ভব হয়। আবার সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক গাড়ির মতো চার্জিং পরিকাঠামোর উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় না। এই কারণে হাইব্রিড এখন এমন এক ধরনের মধ্যবর্তী সমাধান হয়ে উঠছে, যা অনেক ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয়। এরপর রয়েছে ইলেকট্রিক গাড়ি। ব্যাটারির দাম, চার্জিং পরিকাঠামো এবং গাড়ির প্রাথমিক মূল্য নিয়ে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু শহুরে ক্রেতাদের মধ্যে EV-র গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। অর্থাৎ, পেট্রোল গাড়ি এখন একা নয়। তার সামনে CNG, হাইব্রিড এবং EV- তিন ধরনের শক্তিশালী প্রতিযোগিতা।
তবে প্রশ্ন হল, তাহলে কি পেট্রোল গাড়ির ভবিষ্যৎ অন্ধকার? এতটা সরল উত্তর দেওয়া যাবে না। কারণ ভারতের মতো বিশাল দেশে গাড়ির বাজার একরকম নয়। মেট্রো শহরে একজন ক্রেতার প্রয়োজন একরকম। ছোট শহর বা গ্রামীণ এলাকায় প্রয়োজন সম্পূর্ণ আলাদা। যেখানে চার্জিং স্টেশন কম, সেখানে EV এখনও সব মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়। আবার যাঁরা দীর্ঘ দূরত্বে গাড়ি চালান, তাঁদের কাছেও পেট্রোল গাড়ির সুবিধা রয়েছে। CNG-র ক্ষেত্রেও একই সমস্যা- সব জায়গায় পরিকাঠামো সমান নয়। অর্থাৎ, আগামী কয়েক বছরে ভারতের গাড়ির বাজারে সম্ভবত কোনও একটি জ্বালানি একাই রাজত্ব করবে না। বরং তৈরি হবে মাল্টি-ফুয়েল মার্কেট। কেউ কিনবেন CNG। কেউ হাইব্রিড। কেউ EV। আর বহু মানুষ এখনও পেট্রোলেই থাকবেন।
তবে পেট্রোল গাড়ির বাজারে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর E20 সেই পরিবর্তনকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। E20-এর কিছু নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা হলেও এর কিছু সুবিধাও রয়েছে। ইথানল দেশেই উৎপাদন করা যায়। ফলে অপরিশোধিত তেলের আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কার্বন মনোক্সাইড এবং কিছু হাইড্রোকার্বন নির্গমন কমাতেও ইথানল মিশ্রণ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ E20 শুধুই খারাপ- এমনটা যেমন বলা ঠিক নয়, তেমনই E20 নিয়ে মানুষের সমস্ত উদ্বেগ ভিত্তিহীন- এমনটাও বলা যায় না। মূল বিষয় হল সঠিক তথ্য এবং গাড়ির উপযুক্ততা। আপনার গাড়ি E20-compatible কি না, সেটা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে মালিকের উচিত গাড়ি প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা দেখা। কারণ একই জ্বালানি সব ইঞ্জিনে একই ফল দেবে না।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে- এই পরিবর্তনের ফলে গাড়ির বাজারে কী হতে পারে? প্রথমত, গাড়ি নির্মাতারা আরও বেশি করে বিকল্প পাওয়ারট্রেনের দিকে যাবে। দ্বিতীয়ত, ক্রেতাদের সামনে বিকল্প বাড়বে। তৃতীয়ত, গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত শুধু গাড়ির ডিজাইন বা ফিচারের উপর নির্ভর করবে না। মাইলেজ, জ্বালানির দাম, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, ভবিষ্যতের নিয়ম এবং পুনর্বিক্রয় মূল্য- সবকিছু হিসেব করতে হবে। আর চতুর্থত, গাড়ির বাজারে ‘পেট্রোল বনাম ডিজেল’-এর পুরনো লড়াইটা ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে দাঁড়াবে- পেট্রোল বনাম CNG বনাম হাইব্রিড বনাম EV। তাহলে কি আগামী দিনে রাস্তায় পেট্রোল গাড়ি দেখা যাবে না? অবশ্যই যাবে। বরং বহু বছর ধরেই পেট্রোল গাড়ি ভারতের রাস্তায় থাকবে। কিন্তু যে প্রশ্নটা বদলাবে, তা হল- ‘পেট্রোল গাড়িই কেন?’ আগে যেখানে পেট্রোল ছিল স্বাভাবিক পছন্দ, সেখানে এখন সেটি হয়ে উঠছে বহু বিকল্পের মধ্যে একটি। এটাই আসল পরিবর্তন। ভারতের গাড়ির বাজার এখন পেট্রোল থেকে সরাসরি ইলেকট্রিকের দিকে লাফ দিচ্ছে না। বরং ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে একটি নতুন যুগ- যেখানে একই রাস্তায় পেট্রোল, CNG, হাইব্রিড এবং ইলেকট্রিক- সব ধরনের গাড়িই থাকবে।
আর শেষ পর্যন্ত কোন প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হবে, তা ঠিক করবে একটাই বিষয়- ক্রেতার পকেট, প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি। তাই আপাতত বলা যায়- পেট্রোল গাড়ির যুগ শেষ হয়নি। কিন্তু তার একচ্ছত্র রাজত্ব যে শেষের পথে, ভারতের গাড়ির বাজারের বদলে যাওয়া ছবিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।