বক্স অফিসের দৌড়ে কে এগিয়ে?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : দেশভাগের যন্ত্রণা, ধর্মের নামে বিভাজন। আর সেই বিভাজনের মাঝেও মানবিকতার গল্প। এই গল্প নিয়েই বড় পর্দায় ফিরেছেন সানি দেওল। সঙ্গে দীর্ঘ আট বছর পর কামব্যাক প্রীতি জিন্টার। ছবি, ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’। একদিকে প্রায় তিন দশক পর পরিচালক রাজকুমার সন্তোষীর সঙ্গে সানির জোট, অন্যদিকে পর্দায় শাবানা আজমি, প্রীতি জিন্টা, আলি ফজলদের অভিনয়। ছবি দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ সানি দেওলের ‘সাকিনা’ আমিশা পটেলও। তবে, সমালোচকদের প্রশংসা আর তারকাদের ভালোবাসা কি বক্স অফিসে দর্শক টানতে পারছে? কারণ, একই দিনে মুক্তি পাওয়া ‘আওয়ারাপন ২’-এর সঙ্গে বক্স অফিসের লড়াইয়ে আপাতত অনেকটাই পিছিয়ে ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’।
১৯৪৭। একটা বছর, যা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে শুধু স্বাধীনতার বছর নয়। সেই বছরই তৈরি হয়েছিল এক গভীর ক্ষত, দেশভাগের ক্ষত। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘর ছেড়েছিলেন। পরিচিত মানুষ হয়ে উঠেছিলেন উদ্বাস্তু। ধর্মের পরিচয় হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কারণ। এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই তৈরি ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’। পরিচালক রাজকুমার সন্তোষীর ছবিতে সিকান্দার মির্জার চরিত্রে সানি দেওল। দাঙ্গার কারণে মিরাট থেকে স্ত্রী হামিদা ও সন্তানদের নিয়ে তাঁকে পাড়ি দিতে হয় লাহোরে।
রিফিউজি ক্যাম্পের পর আশ্রয় মেলে একটি হাভেলিতে। কিন্তু সেই বাড়িতে তখনও একা বসবাস করেন এক হিন্দু বিধবা, দুর্গা। এখান থেকেই শুরু হয় আসল গল্প। একদিকে ধর্মের বিভাজন, অন্যদিকে ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে সম্পর্কের সেতু। কারণ, যে সম্পর্কের নাম ‘মা’, তার কি সত্যিই কোনও ধর্ম হয়?
দুর্গা প্রথমে মির্জা পরিবারকে নিজের বাড়িতে মেনে নিতে পারেন না। কিন্তু সময় যত এগোয়, বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণ। যে পরিবারকে একসময় তিনি বহিরাগত ভাবছিলেন, তারাই হয়ে ওঠে আপনজন। আর এই সম্পর্কের মাঝেই ছবিতে ঢুকে পড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও হিংসার অন্ধকার। ধর্মের নামে মানুষকে ভাগ করার চেষ্টা চলে। কিন্তু তার বিপরীতে দাঁড়ায় মানবিকতার শক্তি। ছবির সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলির একটি আসে দুর্গার মৃত্যুর পর। একজন হিন্দু বিধবার শেষযাত্রায় কাঁধ দেন মহল্লার মুসলিম পুরুষরা। ধর্ম আলাদা হলেও শোক এক। বিশ্বাস আলাদা হলেও মানবিকতা এক। এই দৃশ্যই যেন ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’-এর মূল বক্তব্যকে সামনে আনে।
আর এই গল্পকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বড় ভূমিকা রয়েছে অভিনেতাদের। আমির খান প্রোডাকশনস প্রযোজিত এই সিনেমায় দুর্গার চরিত্রে অভিনয়ে করেছেন শাবানা আজমি। স্বাভাবিক অভিনয়, সংযত অভিব্যক্তি আর আবেগের ভারসাম্যে চরিত্রটিকে জীবন্ত করেছেন তিনি। সানি দেওল আবার সানি দেওলই। সংলাপের দৃশ্যে তাঁর চেনা গর্জন, অ্যাকশন দৃশ্যে সেই পুরনো শক্তি, সবই রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, বেশ কিছু জায়গায় তাঁর অভিনয়ে পুরনো সানি দেওলের ছায়াও যেন ফিরে এসেছে। আর দীর্ঘদিন পর প্রীতি জিন্টাকেও দেখা গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। হামিদার ভূমিকায় তাঁর অভিনয়ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়াও করণ দেওল, আলি ফজলসহ অন্যান্য অভিনেতারাও গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’ দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি সানি দেওলের ‘সাকিনা’ও। ‘গদর’-এ সানি দেওলের সঙ্গে যে জুটি একসময় দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল, সেই আমিশা পটেলই এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন সানিকে। ছবি দেখে আমিশার বক্তব্য, সানি তাঁর কাছে বরাবরই একজন ‘সেভিয়র’। আর এই ছবিতে একজন মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে আরও গর্বিত করেছে। অর্থাৎ ‘গদর’-এর পর্দার সম্পর্ক যেন বাস্তবের প্রশংসায়ও ফিরে এল। শুধু সানি নন, একই সপ্তাহান্তে আমিশা দেখেছেন ইমরান হাশমির ‘আওয়ারাপন ২’-ও। ইমরানের অভিনয় নিয়েও সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি। দুটি ছবিই তাঁর পছন্দ হয়েছে।
এবার আপনাদের জানাই বক্স অফিসের হিসেব কি বলছে? বক্স অফিসের হিসেব বলছে অন্য এক গল্প। ১৪ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবসের সপ্তাহে মুক্তি পেয়েছে ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’ এবং ‘আওয়ারাপন ২’। দুই ছবিরই সামনে ছিল বড় প্রত্যাশা। কিন্তু তিন দিনের হিসেবেই দেখা যাচ্ছে, ইমরান হাশমির ছবি অনেকটাই এগিয়ে। ‘আওয়ারাপন ২’ প্রথম দিনে প্রায় ২২ কোটি, দ্বিতীয় দিনে ৩৩ কোটি ৭৫ লক্ষ এবং তৃতীয় দিনে ২৬কোটি ২৫লক্ষ টাকা আয় করেছে। অর্থাৎ রবিবার পর্যন্ত ছবিটির নেট সংগ্রহ প্রায় ৮২ কোটি টাকা। অন্যদিকে ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’ প্রথম দিনে ৫কোটি ৭৫লক্ষ , দ্বিতীয় দিনে ১৩কোটি ৫০ লক্ষ এবং তৃতীয় দিনে ৭কেটি ৫০ লক্ষ টাকা আয় করেছে। তিন দিনে এই ছবির নেট সংগ্রহ প্রায় ২৬ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। বিশ্বব্যাপী গ্রস কালেকশন প্রায় ৩৭কোটি ৪১ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ একই সময়ে মুক্তি পেলেও দুই ছবির বক্স অফিস পারফরম্যান্সে রয়েছে বড় ফারাক।
তাহলে কি ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’ ব্যর্থ? কিন্তু শুধু বক্স অফিসের অঙ্ক দিয়েই কি ছবির সাফল্য বিচার করা যায়? ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’-এর ক্ষেত্রে উত্তরটা এতটা সহজ নয়। কারণ ছবিটি শুধু অ্যাকশন বা বিনোদনের গল্প বলছে না। এখানে রয়েছে দেশভাগের ইতিহাস। রয়েছে উদ্বাস্তু মানুষের যন্ত্রণা। রয়েছে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি। আর সবকিছুর ওপরে রয়েছে মানবিকতার বার্তা।
দেশভাগের গল্প নতুন নয়। কিন্তু সেই পুরনো ক্ষতকে নতুন প্রজন্মের সামনে কীভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেখানেই ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’-এর আসল পরীক্ষা। সানি দেওলের অভিনয় পেয়েছে আমিশা পটেলের মতো সহ-অভিনেত্রীর প্রশংসা। সমালোচকরাও ছবির অভিনয় ও মানবিক বার্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বক্স অফিসে আপাতত লড়াইটা কঠিন। একদিকে ‘আওয়ারাপন ২’-এর দ্রুত গতির দৌড়,অন্যদিকে সানি দেওলের ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’—যে ছবি ব্যবসার পাশাপাশি দর্শকের মনে ইতিহাসের প্রশ্নও ছুড়ে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বক্স অফিসে জিতবে কে? সেটাই এখন দেখার।