শর্বরীর ‘সারারাত তাণ্ডব’ মন্তব্যে বিতর্ক

“দেশ-বিরোধী স্লোগান দেওয়ার সাহস দেখাচ্ছে টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং। বলছে দেশ কো টুকড়ে করেঙ্গে।”

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে SFI ও ABVP-র মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে রাতভর উত্তেজনা। বুধবার রাতে ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সভাকে ঘিরে দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে বচসা থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। আহত হন বেশ কয়েকজন। ছাত্র সংগঠনের দু-পক্ষের বচসা ও গোলমালের খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে যান যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায় সারারাত তাণ্ডব চলবে। তিনি আরও বলেন, দেশ-বিরোধী স্লোগান দেওয়ার সাহস দেখাচ্ছে টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং। বলছে দেশ কো টুকড়ে করেঙ্গে। কী মনে করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টাকে নকশাল, দেশ বিরোধী শক্তি দিয়ে ভর্তি করে রাখবেন? সৃজন ভট্টাচার্য, সুজন চক্রবর্তীকে বলব অভিযুক্তদের যদি একঘন্টার মধ্যে আত্মসমর্পণ না-করান, যেখানে লুকিয়ে আছে, এদের টেনে বার করব। সারা রাত তাণ্ডব চলবে।

বিধায়কের আরও মন্তব্য, যেখানে ছাত্র-সংসদ নেই, সেখানে জিবি বৈঠক ডাকল কে? এবিভিপি-র ছেলেরা বিষয়টি সেখানে বলেন। পরে এবিভিপির যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি নিখিল দাসকে জাত তুলে কু-মন্তব্য করা হয়। কেন? সুজন চক্রবর্তী ও সৃজন ভট্টাচার্য উত্তর দিন। এই হুঙ্কার দেওয়ার সময়ে বিধায়কের পাশে যিনি ছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে যাদবপুরে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল এবং সেই ঘটনার জেরে প্রতিবাদও হয়েছিল।

এই আবহেই গোটা ঘটনার দায় অস্বীকার করে এবিভিপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বাম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ সভায় ঢুকে অশান্তি তৈরির চেষ্টা করেছে এবিভিপির লোকজন। এই ঘটনায় এসএফআই শুরুতে কোথাও ছিল না। সৃজনের দাবি, তিনি কলকাতার বাইরে রয়েছেন। মাঝরাতে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কয়েকজন পড়ুয়া নিজেদের মধ্যে সভা করছিলেন। সেখানে এবিভিপির লোকজন ঢুকে তাঁদের উত্যক্ত করার চেষ্টা করে। দুই পক্ষের মধ্যে বচসা হয়। তবে ওই ঘটনায় এসএফআই-এর কেউ ছিল না।এর পর বিজেপির লোকজন ক্যাম্পাসে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় যে ভাবে বাম নেতাদের নাম করে প্রকাশ্যে সরব হচ্ছেন, তাতে প্রশ্ন উঠছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে এত ভয় কেন?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রভোট দ্রুত ঘোষণা করার দাবি তুলেছেন সৃজন। তিনি মনে করেন, যদি এবিভিপি ঠিক হয় তাহলে ছাত্রভোটে দাঁড়িয়ে নির্বাচিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসুক। লড়াই করুক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা বাকি ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে। যা রায় হবে, তা মাথা পেতে মেনে নেবে সকলে।
এই ঘটনা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মনে করছেন তিনি। বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্যকে নিন্দা জানিয়ে সৃজন বলেন, যারা অশান্তি সৃষ্টি করল, তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যস্ত বিধায়ক।

অন্যদিকে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বা ABVP-কে নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্য়ালয়ের ঝামেলায় বিজেপির ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠলেও রাজ্য সভাপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এবিভিপি বিজেপির কোনও শাখা সংগঠন নয়। এটা একটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন।
যাদবপুর ক্যাম্পাসের ঘটনা প্রসঙ্গে বিজেপির রাজ্য সভাপতি জানান, দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন হিসেবে এবিভিপি নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও কর্মসূচি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বিজেপি তাদের ওপর কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না। তিনি বলেন, এবিভিপি বিজেপির শাখা সংগঠন নয়। তারা একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন জাতীয়তাবাদী সংগঠন। তাদের অবস্থান বা সিদ্ধান্ত তারা নিজেরা নেয়, এই নিয়ে দলের কিছু বলার নেই।

ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমালোচনা করে শমীক ভট্টাচার্য জানান, বিজেপি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিতরে দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ সমর্থন করে না। ক্যাম্পাসের বাইরে আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত বা রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হলে বিজেপি প্রতিনিধি হিসেবে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু ক্যাম্পাসের ভেতরে ছাত্র সংগঠনকে চালনা করে রাজনীতি করা বিজেপির কাজ নয়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যাদবপুরে ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে বা টুকড়ে টুকড়ে স্লোগান ওঠার জল্পনা নিয়ে শমীক ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, এই ধরণের স্লোগান যদি সত্যিই উঠে থাকে, তবে যারা তা দিল তারা অক্ষত শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কীভাবে? সেটাই তো বড় প্রশ্ন। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার সকালে যাদবপুরের ঘটনা নিয়ে মুখ খুলে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। তাঁর দাবি, ক্যাম্পাসে দেশবিরোধী কাজ বা স্লোগান বরদাস্ত করা হবে না। এমন ঘটনা ফের ঘটলে যাদবপুরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শুক্রবার সকালে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন দিলীপ ঘোষ। তিনি জানান, কয়েক দিন ইন্দোর থাকায় যাদবপুরের সাম্প্রতিক ঘটনা তিনি বিস্তারিত জানেন না। তবে তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও ধরনের দেশবিরোধী কার্যকলাপ চলতে দেওয়া উচিত নয়। একইসঙ্গে আগের তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে এমন কার্যকলাপে মদত দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।

অবস্থানের দিক থেকে এসএফআই বা ছাত্র পরিষদের মতো সংগঠনের সঙ্গে এবিভিপির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ নিজস্ব আদর্শে চলে। ক্যাম্পাসের বাইরে যদি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ বা কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তবে তা সামলানোর দায়িত্ব পুলিশমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর। সরকারই পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করবে।