আইফোন নিয়ে বচসা, চলে গেল ৩টি প্রাণ !

পাহাড় থেকে খাদে পড়লেন ছেলে, বাবা এবং মা!

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একটা ফোনের দাম কত? বেশ কয়েক হাজার কিংবা তারও বেশি। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে একটি ফোনের দাম কি কখনও তিনটি জীবনের সমান হতে পারে? বাবা-মার চেয়ে একটা ফোনের কদর বেশি। মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের একটি মর্মান্তিক ঘটনা যেন সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিচ্ছে। একটি পারবিবারিক বিবাদ, ক্ষোভ, আবেগের মুহূর্ত এবং একই পরিবারের তিনটি প্রাণ চলে গেল। যে ঘটনা শুরু হয়েছিল একটি মোবাইল ফোনের কিস্তি নিয়ে মনোমালিন্য থেকে। শেষ পর্যন্ত তা পরিণত হল এক ভয়াবহ পারিবারিক ট্র্যাজেডিতে। ঘটনাটি মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সন্তাজিনগর জেলার তিসগাঁও এলাকার খাভদ্যা ডোংগর পাহাড়ে। পুলিশ সূত্রে খবর, কুণাল চাঁন্দগুড়ে নামে ওই তরুণের সঙ্গে তাঁর বাবা-মায়ের মোবাইল ফোন ও তার কিস্তির টাকা নিয়ে বিবাদ হয়েছিল। জানা গিয়েছে, কুণাল একটি দামি আইফোন কিনেছিলেন। তার ইএমআই পরিশোধ নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন। পরিবার কাছ থেকে ইএমআইয়ের টাকা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। রাগ ও অভিমানে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে যায় সে। খাভদ্য ডোংগর পাহাড়ের একটি বিপজ্জনক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ান কুণাল। তাঁর বাবা মুরলীধর ও মা সঙ্গীতা দ্রুত সেখানে পৌঁছে যান। কুণালের মা আকুতিও করেন কিন্তু কাজে আসেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও দমকলকর্মীরও যোগ দেন। পরিস্থিতি বুঝে উদ্ধারকারী দল নিচে নিরাপত্তা জাল তৈরির চেষ্টা করেন। কিন্তু পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা তরুণকে নিরাপদ জায়গায় ফিরিয়ে আনা যাচ্ছিল না। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা চলে। কেউ তাঁকে পরিবারের কথা মনে করিয়ে দেন। কেউ জীবনকে আরেকটি সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানান। স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি এমনকী তাঁকে একটি আইফোন দেওয়ার কথাও বলে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি বদলায়নি।

এরপর আসে সেই ভয়াবহ মুহূর্ত। কুণাল পাহাড়ের কিনারা থেকে নিচে পড়ে যান। তাঁকে আটকাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা মুরলীধর। কিন্তু ছেলেকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টার মধ্যেই তিনিও ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান। চোখের সামনে স্বামী ও সন্তানকে গভীর খাদে পড়ে যেতে দেখে মা সঙ্গীতা ভেঙে পড়েন। এরপর তিনিও পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যান। অল্প কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন মানুষ প্রাণ হারান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের কাছে পুরো বিষয়টি ছিল অবিশ্বাস্য। যে বাবা-মা কয়েক ঘণ্টা ধরে নিজেদের সন্তানকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন শেষ পর্যন্ত সেই সন্তানকে বাঁচাতে গিয়েই তাঁদের জীবনও চলে গেল। পুলিশ পরে দুর্গম এলাকা থেকে তিনজনের দেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এই ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ প্রশ্ন তুলছেন একটি দামি ফোনের জন্য কীভাবে এতটা চরম পরিস্থিতি তৈরি হল? কেউ বলছেন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদা ও মুহূর্তের আবেগ কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এই ঘটনা তারই ভয়াবহ উদাহরণ। শুধু একটি ফোনকে দায়ী করেই এই ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পিছনে থাকতে পারে মানসিক চাপ, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক অস্বস্তি কিংবা সেই মুহূর্তে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার মতো একাধিক কারণ। তাই এই ঘটনাকে শুধু ফোনের জন্য মৃত্যু বলে দেখলে হয়তো আসল সমস্যাটাই আড়ালে থেকে যাবে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই। ঝগড়া,রাগ,অভিমান কিংবা একটি চাহিদা পূরণ না হওয়ার কষ্ট কখনও যেন জীবনের চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে। দামি ফোন, বিলাসবহুল জিনিস কিংবা সামাজিক মর্যাদা এসব ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু চলে যাওয়া মানুষকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের এই ঘটনা তাই শুধু একটি পরিবারের মৃ্ত্যুর গল্প নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুহূর্তের আবেগে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত কতগুলো জীবনকে চিরতরে বদলে দিতে পারে।