বিজেপি কর্মী খুনে গ্রেফতার

বারুইপুরে বিজেপি কর্মী খুনের ঘটনায় পঞ্চায়েত সদস্য-সহ গ্রেফতার চার, দলীয় কোন্দলের অভিযোগ।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : বারুইপুরে বিজেপি কর্মী বাপি প্রামাণিককে কুপিয়ে খুনের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার উত্তর ট্যাঙ্গারবেড়িয়া এলাকায়। এই ঘটনায় বিজেপির এক পঞ্চায়েত সদস্য তথা প্রাক্তন মণ্ডল সভাপতি-সহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করেছে বারুইপুর থানার পুলিশ। ধৃতদের নাম সুজন মণ্ডল, কৃষ্ণা মণ্ডল, কনক মণ্ডল এবং অনিল নাইয়া। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ মনে করছে, দুর্গাপুজোর কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিবাদ থেকেই খুনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এর নেপথ্যে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রবিবার রাতে বারুইপুর থানার হাড়দহ পঞ্চায়েতের উত্তর ট্যাঙ্গারবেড়িয়া এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্গাপুজোর কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ওইদিন দুই পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়। সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি কর্মী বাপি প্রামাণিক এবং তাঁর স্ত্রী। অভিযোগ, বিবাদের মধ্যেই আচমকা ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাপির উপর হামলা চালানো হয়। স্ত্রীর সামনেই তাঁকে এলোপাথাড়ি কোপানো হয় বলে অভিযোগ।

হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন বাপি। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এরপরই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। ঘটনায় মৃতের পরিবারের তরফে বারুইপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।

অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে নামে বারুইপুর থানার পুলিশ। তদন্তের শুরুতেই কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে সুজন মণ্ডলের নাম। এরপর সুজন-সহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে খুনের ঘটনায় তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত রয়েছে কি না, সেই বিষয়েও তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে দাবি, বাপি প্রামাণিকের সঙ্গে সুজন মণ্ডলের দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব ছিল। সেই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত খুনের ঘটনায় গড়িয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিজেপির অন্দরের কোন্দলের জেরেই এই খুন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ধৃত সুজন মণ্ডলকে দলবিরোধী কাজের অভিযোগে আগেই সাসপেন্ড করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ঘটনাটিকে সরাসরি দলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখাতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব। যদিও স্থানীয় স্তরে সুজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, তিনি বিজেপির মণ্ডল সভাপতি পদে ছিলেন এবং পরবর্তীতে দলবিরোধী কাজের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

পুলিশের তদন্তে এখন মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—দুর্গাপুজোর কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিবাদ এবং বাপি প্রামাণিকের সঙ্গে সুজন মণ্ডলের পুরনো দ্বন্দ্ব। এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি খুনের মূল কারণ, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।

বাপির পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতেই চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ। ইতিমধ্যেই ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার পুরো ছবি সামনে আনার চেষ্টা করছে পুলিশ। খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা গিয়েছে কি না, হামলার সময় ঘটনাস্থলে আর কারা উপস্থিত ছিলেন এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে অন্য কারও যোগাযোগ ছিল কি না—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিজেপি কর্মী খুনের ঘটনায় একদিকে যেমন রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তেমনই দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পুজোর কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিবাদ কীভাবে প্রাণঘাতী হামলায় পরিণত হল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বারুইপুর থানার পুলিশ। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার নেপথ্যের আসল কারণ এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে।