দুধের হাঁড়ির আঁচেই উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি!

ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গিয়ে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের একটি ভিডিও ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ময়দানে মুখ্যমন্ত্রীও।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : পথের ধারে এক টুকরো আশ্রয়। আর শিশুর জন্য গরম করা দুধ। জীবনের ন্যূনতম চাহিদাটুকু নিয়েই ফুটপাতে দিন কাটাচ্ছিল একটি পরিবার। কিন্তু সেই দুধই যে একদিন রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, তা হয়তো কেউ ভাবেননি। শিশুর জন্য গরম করা দুধ ঘিরেই এখন উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গিয়ে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের একটি ভিডিও ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠেছিল একের পর এক প্রশ্ন। উচ্ছেদের নামে কি মানবিকতাকেও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? সেই বিতর্কের আঁচ এবার পৌঁছে গেল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাতেও। কী বললেন তিনি। পাল্টা কী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন পুরমন্ত্রী? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি নিশানা করে কী বললেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ? ফলে দুধের সেই হাঁড়ি থেকেই এবার ফুটতে শুরু করেছে রাজ্য রাজনীতি।

ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গিয়ে শিশুর জন্য গরম করা দুধ সত্যিই কি ফেলে দিয়েছিলেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ? দিন দুয়েক ধরেই এই বিতর্কে সরগরম রাজ্য রাজনীতি থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন অনেকেই। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গিয়ে, নগরোন্নয়ন করতে গিয়ে কি মানবিকতা হারিয়ে ফেলছেন বিজেপির নেতা মন্ত্রীরা? সোশ্যাল মিডিয়ায় অগ্নিমিত্রা পালের যে ভিডিও ভাইরাল হয়, সেখানে দেখা যায় ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এক মহিলাকে ফুটপাতে দুধ গরম করতে বারণ করছেন তিনি।

ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যান কুণাল ঘোষ। মহিলার সঙ্গে দেখা করে, তাঁর পরিবার পরিস্থিতির কথা জানার চেষ্টা করেন তিনি। ফুটপাতবাসীদের পুর্নবাসনের পক্ষে সওয়ালও করেন । কিন্তু সত্যিই কি ঘটেছিল সেদিন? কেনই বা ঘটেছিল? সাফাই দেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি বলেন, ফুটপাথের উপর একটি বড় পাত্রে দুধ গরম করা হচ্ছিল। পাশে জ্বলছিল স্টোভ, তারই মধ্যে পথচারী এবং স্কুলপড়ুয়াদের যাতায়াত চলছিল। তাঁর আশঙ্কা, অসাবধানতায় আগুন বা অন্য কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

বিরোধীদের সমালোচনার জবাবও দিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘অনেক কান্নাকাটি শুনলাম। কিন্তু কেউ এক বাটি দুধ নিয়ে ওই পরিবারের কাছে যায়নি। সবাই রাজনীতির আগুনে রুটি সেঁকেছে।’’ তাঁর দাবি, ফুটপাথ দখলমুক্ত রাখার প্রশ্নে ধনী-গরিবের কোনও বিভাজন করা হবে না। ‘‘ফুটপাথ বড়লোকেরও নয়, গরিবেরও নয়। ফুটপাথ মানুষের জন্য,’’ মন্তব্য তাঁর।

শহরের সৌন্দর্যায়নের সঙ্গে বিষয়টি জুড়ে অগ্নিমিত্রার বক্তব্য, রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ এবং শিল্প আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু শহরের রাস্তায় যানজট, অপরিচ্ছন্নতা বা ফুটপাথ দখল হয়ে থাকলে শিল্পপতিদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাবে।

ভাইরাল ভিডিয়োয় তাঁর কথা বলার ধরন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা কার্যত মেনে নিয়েছেন মন্ত্রী। অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘‘আমি হয়তো চিৎকার করে বলেছি। সেটা হয়তো আর একটু নরম করে, আর একটু বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল।’’

২২ অগাস্ট ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ঘটনায় অগ্নিমিত্রার আচরণকে হাতিয়ার করেই তোপ দাগেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, একটা ছোট শিশুর খাবার তৈরি করা হচ্ছিল। সেখানেই ঘটে এই ঘটনা। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি। মমতার কথায়, মহিলা রাজি থাকলে, তিনি কোনও কর্মীর বাড়িতে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন। শিশুটির পড়াশোনার দায়িত্বও নেবেন বলে জানান।


মমতার বক্তব্যের পরেই অগ্নিমিত্রার পাল্টা প্রশ্ন। বলেন, ওই পরিবারটি কতদিন ধরে ওখানে বসবাস করছিল? এতদিন তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়নি কেন? তখন কি ওরা দরিদ্র ছিল না? এখানেই থামেননি তিনি। অগ্নিমিত্রার স্পষ্ট কথা, দায়িত্ব নিতে হলে বেছে বেছে নয়, সকলের দায়িত্ব নিতে হবে।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে পাল্টা খোঁচা দেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। মঙ্গলবার সল্টলেকে মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে ওই শিশু ও মহিলাকে নিয়ে যান বরানগরের বিধায়ক সজল ঘোষ। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথবাসী সীতাদেবী। মহিলাকে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দেন, ফুটপাথে আর থাকতে হবে না। তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। পুরসভাকে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন, দ্রুত তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে।

ওই পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোক পাঠাচ্ছেন, বলছেন টাকা নাও..বিজেপির বিরুদ্ধে বলো টাকা মিলবে।’ কিন্তু তাতে সাড়া না দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন সীতাদেবী। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘সীতাদেবী বলেছেন মুখ্যমন্ত্রীকে ভরসা করি, বিজেপিকে ভরসা করি… মমতার চক্করে নেই।’

এই যখন চলছে তখন থেমে নেই সোশ্যাল মিডিয়াও। অগ্নিমিত্রার আচরণ ও মন্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মাধ্যমে কার্যত ঝড় উঠেছে। অনেকেই তাঁর মন্তব্যে অসংবেদনশীলতা ও অমানবিকতা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, পুরমন্ত্রী শিশুর দুধ ও মাকে দেখতে পান। কিন্তু ফুটপাত দখল করে চলা আরও বড় বড় বিষয় দেখতে পান না। কিংবা দেখেও দেখেন না। কলকাতা শহরজুড়ে কার্যত সব ফুটপাতই দখল হয়ে গিয়েছে। অবাধে রমরমিয়ে চলছে দোকান ও ব্যবসা। চায়ের দোকান, খাবারের দোকান, সেলুন, গ্যারেজ কী নেই। এর একটা বড় অংশই ভিনরাজ্যের হিন্দিভাষীদের দখলে। ভিনরাজ্য থেকে এসে শহর দখল করা এদের বিরুদ্ধে প্রশাসন আগে ব্যবস্থা নিক। আরও ওই শিশু ও মায়ের জন্য মাথার ছাদ দিক। অন্নপূর্ণা দিক। কেউ কেউ পুরমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসাও করেন। তারাও চান, ফুটপাত দখলমুক্ত হোক। কিন্তু সেই অভিযানের মাঝে মানুষের অসহায়ত্বের জায়গা যেন হারিয়ে না যায়। একদিকে শিশুর দুধ, অন্যদিকে ফুটপাতমুক্ত শহরের যুক্তি। মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেই পরিবার, যাদের কাছে ফুটপাতই হয়তো ঘর। অগ্নিমিত্রা পাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর মমতা থেকে শুভেন্দু অধিকারী। একটি ছোট্ট ঘটনাই এখন খুলে দিয়েছে বড় রাজনৈতিক বিতর্কের দরজা। প্রশ্ন একটাই-উচ্ছেদ কি শুধু বেছে বেছে? জায়গা বুঝে, মানুষ বুঝে?