মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬২ হয়েছে। একই সঙ্গে এখনও নিখোঁজ কয়েকশো মানুষ। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাস ডেস্ক : প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কার্যত বিধ্বস্ত নেপাল। বুধবার চিন সীমান্তের কাছে ভোতে কোশি নদী উপত্যকা এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। রাসুয়া-সহ একাধিক এলাকায় নদীর জলের স্রোতে ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬২ হয়েছে। একই সঙ্গে এখনও নিখোঁজ কয়েকশো মানুষ। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলা। হড়পা বান ও ধসের জেরে বহু এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবিতদের সন্ধান চালাচ্ছেন। বহু বাড়ির নিচের তলা কাদা ও পলিতে ঢেকে গিয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজও বাধার মুখে পড়েছে। খারাপ আবহাওয়া এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই বিপর্যয়ে বিদেশি নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। প্রাথমিক তালিকায় ১০৫ জন ভারতীয় নিখোঁজের কথা জানানো হলেও বৃহস্পতিবার নেপালের বিদেশমন্ত্রী বলেন প্রায় ৩০০ ভারতীয় এখনও নিখোঁজ। অনেকেই কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার পথে ছিলেন।
হড়পা বানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের তিব্বত সংলগ্ন জেলা রাসুয়া। তুলনায় কম হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নুয়াকোট এবং ধারিং জেলাও। কাদামাটির প্রবল স্রোতে বিপর্যয় ও প্রাণহানির খবর এসেছে নেপাল সীমান্ত লাগোয়া তিব্বতের স্থলবন্দর জিরঙেও। নেপালের সংবাদমাধ্যমের একাংশের আশঙ্কা, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৃত ও নিখোঁজের তালিকা দীর্ঘতর হতে পারে।
বুধবার দুর্যোগের পর থেকেই একাধিক তত্ত্ব প্রকাশ্যে আসছিল। কেউ বলছিলেন, তিব্বত সীমান্তে ভূমিকম্পের কারণেই এই বিপর্যয়। আবার ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ বলছিলেন, নদীর গতিপথে হিমবাহ ধসের জেরে পাথর এবং বরফের স্তূপ আটকে ছিল। এই অবস্থায় ক্রমশ বাড়তে থাকে জলের চাপ। আর সেই চাপ থেকে ভয়াবহ হড়পা বান। এই আবহে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা USGS জানিয়েছে, প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্প বলে মনে হওয়া সেই কম্পন আসলে হিমবাহ ধস এবং তার সঙ্গে যুক্ত ধসপ্রবাহের ফল। সেই বিপুল বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে এসে নদীতে ভয়াবহ স্রোত তৈরি করে এবং তার ফলেই নেপাল ও তিব্বতে catastrophic বা বিপর্যয়কর প্রভাব পড়ে।
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাসুয়ায় আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষের বাস। তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশ করে এই জেলা দিয়েই বয়ে গিয়েছে ভোতে কোশী নদী। বুধবার সাড়ে ৮টার কিছু পরে আচমকা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমান, তিব্বতের দিক থেকে প্রবেশ করেছে বন্যার জল। প্রাথমিক ভাবে খবর, চিন সীমান্তবর্তী তিমুরে এবং স্যাব্রুবেসী এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তুষারধসের কারণে হিমালয় পর্বতের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বানের বিপদসঙ্কেত দেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালের এক গবেষণায়। তাতে বলা হয়েছিল, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে এই শতাব্দীর গোড়া থেকে শুরু করে প্রতি বছর দেড় ফুটেরও বেশি উচ্চতার বরফ গলে যাচ্ছে হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে। ভারত, চিন, নেপাল, ভুটান, চিন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৪০ বছর ধরে উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি করা গবেষণাপত্রটি সায়েন্স অ্যাডভান্সেস পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল। সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানিয়েছিলেন, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত যে গতিতে বরফ গলছিল হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে, ২০০০ সালের পর থেকে গলছে তার দ্বিগুণ গতিতে।
ভারতও পরিস্থিতির উপর গভীর নজর রাখছে। কেন্দ্রীয় জল কমিশনের সতর্কতার ভিত্তিতে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা NDRF জানিয়েছে, ত্রিশূলী নদীতে হঠাৎ জলস্তর বৃদ্ধির খবর পাওয়া গিয়েছে এবং এর প্রভাবে গণ্ডক নদী দিয়ে বন্যার ঢেউ ভারতে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিহার ও উত্তরপ্রদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় NDRF-এর দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকার প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলে প্রাণহানিতে শোকপ্রকাশ করেছেন এবং সবরকম মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ভারত ১০ টন মানবিক সহায়তা ও বিপর্যয় মোকাবিলার সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নেপালে পাঠিয়েছে।
নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমেরিকা শোকপ্রকাশের পাশাপাশি জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লক্ষ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য নিখোঁজদের দ্রুত উদ্ধার, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং আরও কোনও বিপর্যয় রুখতে নদী উপত্যকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো।