নেপালের বিপর্যয়ের নেপথ্যে কি চিন?

অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত আপার সিয়াং বহুমুখী প্রকল্প তথা Upper Siang Multipurpose Project নিয়ে নতুন করে তৎপরতা বাড়িয়েছে ভারত।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : এক মুহূর্ত আগেও যেখানে ছিল স্বাভাবিক জীবন পরের মুহূর্তেই সেখানে নেমে এল পাহাড়সম জলরাশি। চোখের সামনে ভেসে গেল ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, গাড়ি আর মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল গোটা ভূদৃশ্য। নেপালের চিন সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলার সাম্প্রতিক হড়পা বান মনে করিয়ে দিল হিমালয়ের উজানে একটি বিপর্যয় কী ভয়ংকর গতিতে নেমে আসতে পারে কয়েকশো কিলোমিটার দূরের জনপদে। ২৬ আগস্টের এই বিপর্যয়ে রসুয়া, ত্রিশূলী ও ভোটেকোশী অববাহিকা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৪৫০-এর গণ্ডি পেরিয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা ১,৪০০-র বেশি; তাঁদের মধ্যে ২৮৮ জন ভারতীয়ও রয়েছেন।

কীভাবে শুরু হল বিপর্যয়?

প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, তিব্বত এলাকায় ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের জেরে এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরবর্তী বিশ্লেষণে সেই তথ্য বদলেছে USGS জানিয়েছে, লাংটাং লিরুংয়ের কাছে হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। বিপুল বরফ, পাথর ও মাটি নদীর পথে নেমে আসে। সেই ধসের তৈরি শক্তিশালী কম্পনই ভূমিকম্পের মতো সিসমিক সিগন্যাল তৈরি করে যার শক্তি প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল। অর্থাৎ, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসই ছিল বিপর্যয়ের সম্ভাব্য প্রধান ট্রিগার।

রসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেসি-সহ একাধিক এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর জল আচমকাই ফুলে-ফেঁপে ওঠে। একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে রিপোর্ট এসেছে। নদীর স্রোতে ভেসে গিয়েছে রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। কিন্তু নেপালের এই বিপর্যয়ের পরেই আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। হিমালয়ের উজানে যদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় এত দ্রুত নিচের দিকে ভয়াবহ জলরাশি পাঠাতে পারে তাহলে সেই একই অঞ্চলে যদি মানুষের তৈরি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থাকে, তার ঝুঁকি কতটা? আর সেখানেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে চিনের তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর নির্মীয়মাণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

ব্রহ্মপুত্রে চিনের ‘টাইমবোমা’?

তিব্বত থেকে উৎপত্তি হওয়া ইয়ারলুং সাংপো নদী অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে সিয়াং নামে পরিচিত হয়। এরপর অসমে প্রবেশ করে এই নদীই হয়ে যায় ব্রহ্মপুত্র। শেষ পর্যন্ত নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অর্থাৎ, এই নদীর উজানের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার জল, কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চিন যে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করছে, তার নির্মাণকাজ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার ঘোষণা দেয় বেজিং। প্রকল্পটিতে একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে এবং বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
অরুণাচলে ত্রমাগত কাউন্টডাউন চলছে একটি চিনা টাইমবোমার। নাম মেদগ মেগা ড্যাম। ২০৩৩ সালের মধ্যেই প্রকল্পটি শেষ করে ফেলতে চাইছে শি জিনপিংয়ের সরকার।

চিনের বক্তব্য, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচ্ছন্ন শক্তি বৃদ্ধি। বেজিংয়ের দাবি, এর ফলে নিম্ন অববাহিকার দেশগুলির জল সরবরাহে বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। কিন্তু ভারতের উদ্বেগ অন্য জায়গায় একটি আন্তর্জাতিক নদীর উজানে এত বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হলে ভবিষ্যতে জলপ্রবাহ, পলি পরিবহণ এবং আকস্মিক জল ছাড়ার মতো বিষয়গুলির উপর তার প্রভাব কী হবে? বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, শুষ্ক মরশুমে এই প্রকল্পের কারণে ব্রহ্মপুত্রের নিম্ন অববাহিকায় জলপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। কিছু বিশ্লেষণে সর্বোচ্চ প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাসের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।

ভারতের উদ্বেগ কোথায়?

১. জলপ্রবাহ কমার আশঙ্কা

২. কৃষিতে প্রভাব

৩. শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ

৪. পলি পরিবহণে পরিবর্তন

৫. নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হওয়া

চিনের প্রকল্পের পাল্টা প্রস্তুতি ভারতের

বেজিংয়ের এই মেগা প্রকল্পকে ঘিরে নয়াদিল্লিও বসে নেই। অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত আপার সিয়াং বহুমুখী প্রকল্প তথা Upper Siang Multipurpose Project নিয়ে নতুন করে তৎপরতা বাড়িয়েছে ভারত। প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু জলবিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, জল সংরক্ষণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।
প্রকল্পটির ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। পুরনো সরকারি নথিতে আপার সিয়াং প্রকল্পের ক্ষমতা ৯,৭৫০ মেগাওয়াট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় প্রায় ১১,০০০ মেগাওয়াটের প্রকল্প হিসেবেও এটি আলোচিত হচ্ছে। তাই এটিকে সরাসরি ১১ হাজার মেগাওয়াটের নির্মীয়মাণ বাঁধ না বলে প্রস্তাবিত বৃহৎ জলবিদ্যুৎ ও জলসংরক্ষণ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিনের প্রকল্পের সঙ্গে ভারতের প্রকল্পকে সরাসরি বাঁধ বনাম বাঁধ প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলেও বিষয়টির গভীরে রয়েছে জল নিরাপত্তা। কারণ ব্রহ্মপুত্র শুধু একটি নদী নয়। এটি অরুণাচল থেকে অসম, তারপর বাংলাদেশ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

ভারতের চিন্তা তিব্বতে অঘটন ঘটলে প্রভাব অরুণাচেলও প্রভাব পড়তে পারে। ভারত নেপালকে ইতিমধ্যেই দুদফার ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চিন ও নেপালে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জায়সওয়ালের বক্তব্য, মূলত ত্রাণের কাজে সাহায্য, আটকে পড়া ভারতীয় তীর্থযাত্রী, পর্যটকদের উদ্ধার নিয়ে বৈঠক হয়েছে।

তাহলে কি নেপালের বিপর্যয়ের জন্য চিন দায়ী? এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তথ্য অনুযায়ী, নেপালের সাম্প্রতিক হড়পা বানের জন্য চিনের নির্মীয়মাণ ব্রহ্মপুত্র বাঁধকে দায়ী করার কোনও প্রমাণ এখনও নেই। নেপালের বিপর্যয় ঘটেছে এমন একটি এলাকায় যেখানে হিমবাহ, তুষার, খাড়া পাহাড়ি ঢাল এবং নদীর সংকীর্ণ উপত্যকা। সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। USGS-এর বিশ্লেষণও হিমবাহ ধস ও পরবর্তী debris flow-কেই সম্ভাব্য মূল কারণ হিসেবে দেখছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

কারণ নেপালের ঘটনা অন্য একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। উজানের কয়েক ঘণ্টার একটি ঘটনা কীভাবে নিম্নাঞ্চলে কয়েক হাজার মানুষের জীবন ও পরিকাঠামোকে বিপন্ন করে দিতে পারে। আর সেই কারণেই ইয়ারলুং সাংপো প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে শুধু জল কমে যাবে এই একটি আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। বিষয়টি জল নিরাপত্তা, পরিবেশ, ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি এবং কৌশলগত নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

নেপালের বিপর্যয়ের পরও আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। চিন ও নেপাল দুই দেশই নতুন করে তৈরি হওয়া জলাধার বা debris-dammed lake নিয়ে সতর্ক করেছে। চিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিব্বত অঞ্চলে একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদে দ্রুত জল জমছে এবং আগামী কয়েক দিনে সেখানে আরও জল ঢোকার সম্ভাবনা রয়েছে। হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। নেপালও ভোটেকোশী, ত্রিশূলী-সহ নদীগুলির তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক করেছে।

চিন ও নেপালের সম্পর্ক ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে। নেপালের বিপর্যয়ের পর চিনের দিকে আঙুল উঠেছে। আবার বেজিং সেই অভিযোগ অস্বীকারও করেছে। কিন্তু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের বৈজ্ঞানিক কারণ আর একটি বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্য ঝুঁকি। দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। বরং নেপালের এই বিপর্যয় আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

হিমালয়ের উজানে যখন প্রকৃতি এবং মানুষের তৈরি বিশাল পরিকাঠামো পাশাপাশি অবস্থান করছে, তখন সীমান্ত পেরিয়ে আসা জলরাশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?

একদিকে গলছে হিমবাহ, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি। অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির একটি। মাঝখানে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। যাদের কোটি কোটি মানুষের জীবন নির্ভর করছে সেই নদীর উপর। নেপালের বিপর্যয় কি শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি এক পেছনে আরও কোনও বড় আশঙ্কা ?