হাইকোর্টে নজির কিন্নর নেত্রীর!

অনুপ্রবেশকারী হঠাও আন্দোলন থেকে শারদ সম্মান, কলকাতা হাইকোর্টে মামলা লড়ে নজির গড়ছেন কিন্নর নেত্রী রূপালি মল্লিক।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : ​বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী কিন্নরদের বিরুদ্ধে চলা তীব্র আন্দোলন এবং তার জেরে উদ্ভূত সামাজিক ও আইনি সংঘাতে বর্তমানে কিন্নর মহলের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ভারতীয় কিন্নর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের কর্ণধার রূপালি মল্লিক। সংগঠনের পক্ষ থেকে জোরালো অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের একটি প্রভাবশালী চক্র তার বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করা থেকে শুরু করে তাকে খুনের মতো জঘন্য চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এত কিছুর পরেও প্রাণের ভয়ে পিছপা হননি রূপালি মল্লিক। বরং আইনি পথেই এর মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্ত সুইটি কিন্নর ও তার সহযোগী আবুর বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে দুটি জোরালো মামলা দায়ের করেছেন। ​এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে রাজভবনের ভেতরে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, সেই অনুষ্ঠানেও অনুপ্রবেশকারী সুইটি হিজরা রূপালি মল্লিকের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে বর্তমানে হেয়ার স্ট্রিট থানা এবং রাজভবনের নিজস্ব বিশেষ তদন্তকারী সংস্থা যৌথভাবে এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালাচ্ছে। এই শত প্রতিকূলতা, আইনি লড়াই এবং শারীরিক নিধনের হুমকির মধ্যেও রূপালি মল্লিকের নিরলস ও একান্ত প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে সুসংগঠিত হয়ে উঠছেন এ রাজ্যের আসল ভারতীয় সনাতনী কিন্নর ও হিজরা সমাজ। ​এই আন্দোলনের আবহে কিন্নর সমাজের ইতিহাসেও একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করতে চলেছে রূপালি মল্লিকের সংস্থা। চলতি বছরে বাংলায় এই প্রথম কোনো কিন্নর সংগঠন শহর কলকাতার বাছাই করা ১০টি শ্রেষ্ঠ দুর্গাপূজা কমিটিকে হাতে তুলে দিতে চলেছে মর্যাদাপূর্ণ “শারদ সম্মান ২০২৬”। পুজোর মরশুমে এই অভিনব উদ্যোগ কিন্নর সমাজের মূলস্রোতে ফেরার লড়াইকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। রূপালি মল্লিকের স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন বার্তা, কিন্নরদের জীবিকা যেন হাত পেতে ভিক্ষাবৃত্তি না হয়ে তাদের মেধা ও প্রতিভা অনুযায়ী সঠিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। সমাজের সাধারণ মানুষের মতোই সমানাধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তারা বদ্ধপরিকর।
​সংগঠনের অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত দীর্ঘ জমানায় বা তার পরবর্তী সময়েও প্রান্তিক এই সম্প্রদায় কোনো দিনই কোনো উল্লেখযোগ্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা পুনর্বাসনের সুবিধা পায়নি। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তারা আরও জোরালোভাবে নিজেদের অধিকারের দাবিতে সরব হয়েছেন। তাদের মূল স্লোগান— “আগে অনুপ্রবেশকারী হঠাও, তারপর ভারতীয় কিন্নরদের জন্য সঠিক সরকারি উদ্যোগ”। রূপালি মল্লিকদের এই সুনির্দিষ্ট ও কড়া আন্দোলনে ইতিমধ্যেই নৈতিক সহমত পোষণ করেছেন রাজনৈতিক নেত্রী তথা মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল এবং প্রশাসনের একাধিক শীর্ষস্থানীয় সরকারি আমলা।
​সম্প্রতি রূপালি মল্লিক ও তার সংগঠনের প্রতিনিধিরা সরাসরি সাক্ষাৎ করেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পলের সঙ্গে। এই সাক্ষাতের পরেই মন্ত্রী একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আনেন। তিনি প্রকাশ্যে মেনে নেন যে, বর্তমানে বাংলার মোট কিন্নরের প্রায় ৮০ শতাংশই বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে এদেশে আসা অনুপ্রবেশকারী। মন্ত্রীর এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তির পর কিন্নর সমাজের অন্দরে চলা অপরাধ চক্র ও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি রাজ্যজুড়ে এক বিরাট রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
​সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে দুর্গাপূজার প্রাক্কালে রূপালি মল্লিকের উদ্যোগে আয়োজিত হতে চলা “শারদ সম্মান ২০২৬” অনুষ্ঠানটি কিন্নর সমাজের মূলস্রোতে আত্মপ্রকাশের একটি অন্যতম বড় মাইলফলক হয়ে উঠেছে। একদিকে বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এবং অন্যদিকে সমাজের সর্বস্তরে সমান অধিকার আদayasের এই যুগপৎ সংগ্রামই এখন বাংলার কিন্নর আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি।