ডলার সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে ট্রাম্পের হুমকিতে লুকিয়ে কোন বড় রহস্য?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির মানচিত্রে ব্রিকস (BRICS) জোট এবং মার্কিন ডলারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া হুঁশিয়ারি এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং মুদ্রার বিশ্বব্যাপী প্রভাব ধরে রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আগ্রাসী বার্তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নানা রহস্য ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে ব্রিকস?
অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মতো ব্রিকসের নিজস্ব কোনো স্থায়ী সদর দপ্তর, সংসদ বা সরকার নেই। পালাক্রমে প্রতি বছর একটি সদস্য দেশ এর সভাপতিত্ব করে এবং বাণিজ্য, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ বা এনডিবি এবং কন্টিনজেন্ট রিজার্ভ অ্যারেঞ্জমেন্টের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করেছে যে, ব্রিকস কেবল কথার কথা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিকল্প পরিকাঠামো গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার গণ্ডি পেরিয়ে মিশর, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলো এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এখন আকাশছোঁয়া।
ট্রাম্পের মূল হুমকি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা
ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলো (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া নতুন সদস্য রাষ্ট্রগুলো) যখন আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যে নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার ও ‘ডি-ডলারাইজেশন’ (De-dollarization)-এর গতি বাড়াচ্ছে, তখন ট্রাম্প স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন:
১০০% ট্যারিফ বা শুল্কের হুমকি: ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ব্রিকস দেশগুলো যদি মার্কিন ডলারকে বিকল্প কোনো মুদ্রা দিয়ে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করে বা নিজস্ব ব্রিকস কারেন্সি চালু করে, তবে আমেরিকায় তাদের রপ্তানির ওপর ১০০% পর্যন্ত শুল্ক বসানো হবে।
অতিরিক্ত ১০% শুল্ক আরোপ: ব্রিকসের “অ্যান্টি-আমেরিকান” বা মার্কিন-বিরোধী অর্থনৈতিক নীতির সাথে যে সকল দেশ একাত্মতা প্রকাশ করবে, তাদের ওপর অতিরিক্ত ১০% শুল্ক ধার্য করার কথা ঘোষণা করেন তিনি।
ট্রাম্পের হুমকির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ৪টি বড় রহস্য
ট্রাম্পের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে কেবল অর্থনৈতিক ভয় নয়, বরং আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার গভীরে থাকা কিছু কৌশলগত কারণ লুকিয়ে রয়েছে:
১. ‘সংশোধনমূলক অস্ত্র’ হিসেবে ডলারের ক্ষমতা হ্রাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন ডলার বিশ্ব বাণিজ্য ও রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে একক আধিপত্য বজায় রেখেছে। আমেরিকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) এবং SWIFT ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্যান্য দেশকে কোণঠাসা করে রাখে। ব্রিকস দেশগুলো যদি বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম ও স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ায়, তবে ওয়াশিংটনের এই ভূ-রাজনৈতিক চাল চালার ক্ষমতা এক লহমায় ভেস্তে যাবে।
২. আমেরিকার বিপুল ঋণ ও মুদ্রাস্ফীতি সংকট
মার্কিন অর্থনীতি বর্তমানে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণের বোঝার নিচে চেপে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা রয়েছে বলেই আমেরিকা নতুন ডলার ছাপিয়ে নিজের ঋণ ও বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে পারে। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের রিজার্ভ কমানো শুরু করলে (যা ইতিমধ্যে সোনা কেনা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে) যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারের ধাক্কা আসবে। ট্রাম্পের উদ্বেগের মূল কারণ এটিই।
৩. ‘বাণিজ্য চুক্তি’ ও দর কষাকষির কৌশল
অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের এই শুল্ক হুমকি আসলে এক ধরণের অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল বা দর কষাকষির হাতিয়ার । ভারত, ব্রাজিল, বা চীন যাতে মার্কিন অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা না কমায়, তার জন্য শুল্কের ভয় দেখিয়ে তাদের মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করাই এই বার্তার আসল উদ্দেশ্য।
৪. ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগানো
ব্রিকস জোট একটি একক মুদ্রা চালু করার পথে হাঁটবে নাকি স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াবে—তা নিয়ে নিজেদের মধ্যেই মতভেদ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত ব্রিকসের একক মুদ্রার চেয়ে নিজস্ব রূপির আন্তর্জাতিকীকরণ এবং পশ্চিমের সাথে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেয়। ট্রাম্পের এই চরম হুমকি ব্রিকস জোটের অভ্যন্তরীণ এই ফাটল ও মতবিরোধকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ব্রিকস বনাম মার্কিন ডলার: বর্তমান বাস্তবতা
ধীর কিন্তু নিশ্চিত পরিবর্তন: বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের অর্ধেকের বেশি লেনদেন এখনো ডলারে হলেও বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ডলারের শতাংশ ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে।
বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম: রাশিয়া ও চিন ইতিমধ্যেই নিজস্ব পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর মাধ্যমে ডলার এড়িয়ে তেল ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছে।
সংক্ষেপে, ট্রাম্পের চড়া সুর ও চরম হুমকি মার্কিন ডলারের অপ্রতিরোধ্য শক্তির পরিচয় নয়, বরং এটি ডলারের ক্ষীয়মান একচ্ছত্র আধিপত্য এবং উদীয়মান বহু-মেরু বিশ্বব্যবস্থার প্রতি আমেরিকার গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ।