আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’!

ব্রিকসের জন্য ডুমস ডে প্লেনে করে ভারতে এলেন পুতিন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ভারতের মাটিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিক্‌স (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কো থেকে যে বিশেষ রাষ্ট্রীয় বিমানে চড়ে নয়াদিল্লিতে এসেছেন, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক মহলে তা “উড়ন্ত ক্রেমলিন” (Flying Kremlin) বা “প্রলয় বিমান” (Doomsday Plane) নামে পরিচিত।
​উড়ন্ত অবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ শাসনব্যবস্থা পরিচালনা ও পারমাণবিক যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিমানটি আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির অন্যতম রহস্যময় ও শক্তিশালী সৃষ্টি।


​’উড়ন্ত ক্রেমলিন’ কী?
​মূলত রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির জন্য ব্যবহৃত বিশেষ বিমানটির মডেল হলো Ilyushin Il-96-300PU (সংক্ষেপে ‘PU’ বা রুশ ভাষায় Punkt Upravleniya, যার অর্থ ‘কমান্ড পোস্ট’ বা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র)। ক্রেমলিন (রাশিয়ার প্রশাসনিক কার্যালয়) যেভাবে স্থলভাগে দেশের মূল চালিকাশক্তি, ঠিক তেমনি এই বিমানটি আকাশে অবস্থানকালেও রাষ্ট্রপতির জন্য ক্রেমলিনের যাবতীয় সুবিধা এবং সামরিক ক্ষমতা নিশ্চিত করে। তাই একে “উড়ন্ত ক্রেমলিন” বলা হয়।
​কেন একে ‘ডুমসডে প্লেন’ বা ‘প্রলয় বিমান’ বলা হয়?
​তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক হামলা বা জাতীয় চরম সংকটের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতে যখন ভূপৃষ্ঠের সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা বা সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে যাবে, তখনও এই বিমানটি আকাশে ভেসে থেকে একটি উড়ন্ত পারমাণবিক কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করতে পারবে।


পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু: এই বিমান থেকেই রুশ প্রেসিডেন্ট বিশ্বজুড়ে থাকা রাশিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন, স্থলভিত্তিক মিসাইল সাইলো এবং পরমাণু বোমারু বিমানকে আঘাত হানার নির্দেশ (Nuclear Launch Order) দিতে পারেন।
ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস (EMP) থেকে সুরক্ষা: পরমাণু বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট বিধ্বংসী ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গে সাধারণ ইলেকট্রনিকস বিকল হয়ে যায়। কিন্তু এই বিমানটিকে বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক আবরণে এমনভাবে মুড়ে দেওয়া হয়েছে যে পরমাণু বিস্ফোরণের তীব্র তরঙ্গেও এর অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার বা যোগাযোগ ব্যবস্থা অকেজো হয় না।
জানালাবিহীন বিশেষ নকশা: প্রলয় বিমানের প্রথাগত রূপগুলোর (যেমন Il-80) ককপিট ছাড়া কেবিনে কোনো কাঁচের জানালা থাকে না, যাতে নিউক্লিয়ার ফ্ল্যাশ (পরমাণু বিস্ফোরণের তীব্র আলো) ও তাপমাত্রার প্রভাব থেকে ভেতরের রাষ্ট্রপ্রধানকে রক্ষা করা যায়।



​কেন শত্রু মিসাইলও আকাশে নিস্তেজ হয়ে পড়ে?
​এই বিমানটিতে বিশ্বের অন্যতম সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা এবং কাউন্টার-মেজারস সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে:
​ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও রাডার জ্যামিং: বিমানটিতে থাকা শক্তিশালী ইলেকট্রনিক ওয়্যারফেয়ার প্রযুক্তি (Radar Jamming System) শত্রু দেশের যেকোনো রাডার ট্রেকিং এবং ট্র্যাকিং সিস্টেমকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করে দিতে পারে।
লেজার ও ইনফ্রারেড ডিকয় মিসাইল প্রতিরক্ষা: বিমানের দিকে কোনো ক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল ধেয়ে এলে এর স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইনফ্রারেড ডিকয় (Flares) এবং তাপীয় সিগন্যাল নির্গত করে শত্রু মিসাইলকে লক্ষ্যচ্যুত করে আকাশেই ধ্বংস বা নিস্তেজ করে দেয়।
বিমানের প্রধান কারিগরি ফিচার ও সুবিধা:- বৈশিষ্ট্যবিবরণ
মডেলIlyushin Il-96-300PU
ওজনপ্রায় ২৭০ টন (২৭০,০০০ কেজির বেশি)
আকারদৈর্ঘ্য ৫৫.৩৫ মিটার, ডানার বিস্তার (Wingspan) ৬০.১২ মিটার
ইঞ্জিন ও রেঞ্জ৪টি Aviadvigatel PS-90A ইঞ্জিন; জ্বালানি না ভরেই ১১,০০০ কিমি উড়তে সক্ষম (ইন-ফ্লাইট রিফুয়েলিংয়ের সুবিধা রয়েছে)


সিকিউরিটি ডিকয় (ছদ্মবেশ)নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের দুটি অভিন্ন বিমান একসঙ্গে আকাশে উড্ডয়ন করে। মূল বিমানে কে আছেন তা সিকিউরিটি প্রধান ছাড়া কেউ জানতে পারেন না।
অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোসাউন্ডপ্রুফ কনফারেন্স রুম, প্রেস রুম, সোনার প্রলেপযুক্ত বাথরুম, লাক্সারি স্যুট, মিনি জিম ও আধুনিক মেডিকেল কেয়ার ইউনিট।

রাশিয়ান রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার সর্বোচ্চ স্তরের এই বিমানটির উপস্থিতির কারণে প্রতিবারই ভ্লাদিমির পুতিনের যেকোনো আন্তর্জাতিক সফর বিশ্বের প্রতিরক্ষাবিশেষজ্ঞদের কাছে কৌতুহলের কেন্দ্রে পরিণত হয়।