পুতিন-জিংপিংকে সঙ্গে নিয়েই বিশ্ব শাসনের ‘পিরামিড’ বদলের ডাক দিলেন মোদী

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ভারতে আয়োজিত ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে বিশ্ব পরিচালনার বিদ্যমান কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করে সার্বিক পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বর্তমান বিশ্ব পরিচালন ব্যবস্থাকে একটি “পিরামিড”-এর সাথে তুলনা করে তিনি গ্লোবাল সাউথ বা বিকাশমান বিশ্বকে বিশ্ব ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বার্তা দেন।
বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু ও বিশ্লেষণ
১. বিশ্ব শাসনের “পিরামিড” বনাম “পার্টনারশিপ”
প্রাধান্যের পিরামিড (Pyramid of Privilege): প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, বর্তমান বিশ্ব শাসনের কাঠামোটি একটি পিরামিডের মতো। যেখানে ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচ্ছত্র ক্ষমতা একদম শীর্ষে থাকা কয়েকটি উন্নত দেশের হাতে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, নিচে অবস্থান করা দেশগুলো এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব ভোগ করলেও তাদের নীতি নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখতে দেওয়া হয় না।
অংশীদারিত্বের প্ল্যাটফর্ম (Platform of Partnership): তিনি এই সুবিধাবাদী পিরামিড কাঠামো ভেঙে একটি “অংশীদারিত্বের প্ল্যাটফর্মে” রূপান্তরের আহ্বান জানান, যেখানে প্রতিটি দেশের সমান কণ্ঠস্বর ও মর্যাদা থাকবে।

২. গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা বদল (Rule-Takers to Rule-Shapers)
প্রথম সারির সংকট, শেষ সারির ক্ষমতা: মোদি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক যেকোনো সংকট বা সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলো। তারা সংকটের সময় প্রথম সারিতে থাকে, অথচ বিশ্বমঞ্চে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের শেষ সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়।
আইন মানার বদলে আইন তৈরির অধিকার: উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কেবল তৈরি নিয়ম মেনে চলা (Rule-Taker) থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বৈশ্বিক আইন ও নীতি প্রণয়নের (Rule-Shaper) ভূমিকায় আসার আহ্বান জানান তিনি।
১০ দফা সংস্কার রোডম্যাপ ও ৩ মূল স্তম্ভ
গ্লোবাল শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে মোদি ব্রিকস সম্মেলনের মাধ্যমে ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব (10-Point Reform Roadmap) পেশ করেন। এই সংস্কার প্রস্তাব তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
স্তম্ভলক্ষ্য ও প্রস্তাবনা
১. প্রতিনিধিত্ব (Representation)UNSC ও বৈশ্বিক আর্থিক সংস্কার: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) স্থায়ী সদস্যপদ ও সংস্কার প্রক্রিয়া আর বিলম্বিত করা যাবে না। পাশাপাশি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থায় অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে ভোটদান ও নেতৃত্বের ক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
২. সাড়া প্রদান (Responsiveness)জরুরি সহায়তা নেটওয়ার্ক: প্রাকৃতিক বা মানবিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকরের জন্য ‘Seafarers Emergency Support Network’-এর মতো নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বার্তা দেওয়া হয়েছে, যাতে বৈশ্বিক পদক্ষেপে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো যায়।
৩. নীতি প্রণয়ন (Rule-Making)প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের নিয়মকানুন: এআই (AI), সাইবারস্পেস, মহাকাশ বিজ্ঞান এবং বায়োটেকনোলজির মতো আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সম-অধিকার নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
মঞ্চে পুতিন ও জিনপিং: পশ্চিমা বিশ্বের সাথে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্কের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির এই ব্রিকস সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। পুতিন ও জিনপিংকে পাশে নিয়ে মোদীর এই বার্তা পশ্চিমা মোড়লতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বৈশ্বিক ঐক্যমতের ইঙ্গিত দেয়।
কাউকে বাদ দিয়ে নয়: মোদী জোর দিয়ে বলেন, ব্রিকস কোনো জোট বা বিশেষ দেশের বিরুদ্ধে কাজ করে না; বরং সবাইকে সাথে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর উদ্দেশ্য।