২০২৫ সালে উত্তর সীমান্তে চিনের পিএলএ-র মোতায়েনে উল্লেখযোগ্য হ্রাস পেয়েছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ভারত-চিন সীমান্ত থেকে এবার বড় খবর। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা অর্থাৎ এলএসি বরাবার সেনা মোতায়েন কমিয়েছে চিন। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সাম্প্রতিক বার্ষিক রিপোর্টে উঠে এসেছে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ২০২৫ সালে ভারতের উত্তর সীমান্তের বিপরীতে চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ-র মোতায়েন উল্লেখযোগ্য হ্রাস পেয়েছে। তবে একইসঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক স্পষ্ট করে দিয়েছে সীমান্ত পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল, কিন্তু সংবেদনশীল।তাহলে ঠিক কতটা সেনা কমিয়েছে চিন? কেনই বা কমানো হল? আর এর ফলে ভারত-চিন সীমান্তে কি সত্যিই উত্তেজনা কমছে?
চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ANNUAL REPORT 2025-26 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উত্তর সীমান্তে চিনের পিএলএ-র মোতায়েনে উল্লেখযোগ্য হ্রাস পেয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এলএসি সংলগ্ন এলাকায় এবং চিনের প্রচলিত সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকায় ১০টি করে COMBINED ARMS BRIGADE SIZE FORCE মোতায়েন ছিল। অর্থাৎ, সীমান্তে আগের তুলনায় চিনা বাহিনীর উপস্থিতি কমেছে। তবে রিপোর্টে মোট সৈন্যসংখ্যার নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি। কিছু রিপোর্টে একটি COMBINES ARMS BRIGADE-এর আকারের ভিত্তিতে দশ হাজার সেনা কমানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে এটাকে সরাসরি নিশ্চিত সৈন্যসংখ্যা হিসাবে দেখছে না প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল-পিএলএ-র মোতায়েন কমেছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কতজন সেনা সরানো হয়েছে, তা সরকারি রিপোর্টে বলা হয়নি।
গালওয়ান সংঘাতের পর বদলেছে পরিস্থিতি। ওই সংঘাতের পর লাদাথ সীমান্তে ভারত ও চিন-দু দেশই বিপুল সংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছিল। চিনা বাহিনীর উপস্থিতিও ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। পরবর্তী চার বছর ধরে সীমান্তে তৈরি হয়েছিল তীব্র সামরিক উত্তেজনা। এরপর দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৪ সালে ডেপসাং এবং ডেমচোক এলাকায় সেনা পিছিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্ট বলছে, সেই সমঝোতার পর ২০২৫ সালে উত্তর সীমান্তের বিপরীতে চিনা বাহিনীর মোতায়েনের মাত্রা কমেছে।
চিন সেনা কমালেও ভারত এখনও সীমান্তে নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি কমাচ্ছে না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এলএসি-র সব সেক্টরেই ভারতীয় সেনার মোতায়েন রোবুস্ট এবং ওয়েল পয়েসড-অর্থাৎ শক্তিশালী এবং যেকোনও পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। অর্থাৎ দিল্লির বার্তা পরিষ্কার-চিন সেনা কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভারত সীমান্তে নজরদারি কমাচ্ছে না। সীমান্তে সেনা কমার পাশাপাশি ভারত-চিন সম্পর্কেও কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে দু দেশের মধ্যে সামরিক এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের disengagement-এর পর ২০২৫ সালে উত্তর সীমান্তে তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মূল্যায়ন। অর্থাৎ, সেনা কমানোর এই পদক্ষেপকে ভারত-চিন সম্পর্কের ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। চিন সেনা কমলেও সীমান্তে চিনের সামরিক পরিকাঠামো এবং দ্রুত সেনা ও অস্ত্র সরানোর ক্ষমতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। তাই শুধু সেনা সংখ্যা কমলেই যে সীমান্ত সমস্যা পুরোপুরি মিটে গেল—এমনটা বলছে না ভারত। বরং দিল্লির কৌশল হচ্ছে—একদিকে কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে LAC-এ নিজেদের শক্তিশালী সামরিক অবস্থান বজায় রাখা।
রিপোর্টে অপারেশন সিঁদুর-এর অভিজ্ঞতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সেনার মতে, এই অভিযানে দেশের বহুস্তরীয় যুদ্ধক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা এবং তিন বাহিনীর যৌথ অপারেশন পরিচালনার প্রস্তুতি স্পষ্ট হয়েছে। অভিযানের পর নিজেদের সক্ষমতার ঘাটতি পর্যালোচনা করে বাহিনী পুনর্গঠন, আরও বেশি জয়েন্টনেস এবং নতুন প্রযুক্তি দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করার দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও রিপোর্টে ইতিবাচক ছবি তুলে ধরা হয়েছে। সেনার দাবি, সামগ্রিক পরিস্থিতি দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণের রয়েছে। হিংসার মাত্রা কমেছে, বিক্ষোভের ঘটনা হ্রাস পেয়েছে এবং ২০২৫ সালে পাথর ছোড়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের সরকারি ও সেনা পরিচালিত উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণও বেড়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে Operation Sindoor-এর সময় জম্মু-কাশ্মীর এবং Line of Control-এর পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছিল। ২০২৫ সালের ১০ ও ১২ মে দুই দেশের Directors General of Military Operations বা DGMO-র মধ্যে আলোচনার পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্থিতিশীল হয়। যদিও ভারতীয় সেনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, সীমান্তে অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৫ সালে LoC দিয়ে জঙ্গি অনুপ্রবেশের ছয় টা চেষ্টা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সেনা। সেই সময় ১২ জন পাকিস্তানি জঙ্গিকে নিকেশ করা হয়। আগের বছরের তুলনায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা কমলেও সেনার মূল্যায়ন, জঙ্গিরা এখন আন্তর্জাতিক সীমান্তকেও বেশি ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে মাদক এবং যুদ্ধের কাজে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী পাচারে সীমান্তপথ ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।