বারান পুরসভায় ৬০টি আসনের মধ্যে ৩১টি আসন জিতে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে AAP।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : রাজস্থানে ভোটের লড়াই মানেই সাধারণত বিজেপি বনাম কংগ্রেস-এর দ্বিমুখী লড়াই। কিন্তু ২০২৬-এর পুরভোটের ফল বলছে রাজস্থানের শহুরে রাজনীতিতে এবার গল্পটা একটু অন্যরকম। কারণ বিজেপি সবচেয়ে বড় দল হয়েও একাধিক শক্ত ঘাঁটিতে ধাক্কা খেয়েছে। কংগ্রেস এমন কিছু জায়গায় বোর্ড গড়ার মতো ফল করেছে, যেখানে বিজেপিকে শক্তিশালী বলে মনে করা হত। আর এর মাঝেই আম আদমি পার্টি দিয়েছে সবচেয়ে বড় চমক। বারান পুরসভায় ৬০টি আসনের মধ্যে ৩১টি আসন জিতে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে AAP।
কংগ্রেস পেয়েছে ১৮, বিজেপি মাত্র ৯। অর্থাৎ, রাজস্থানে AAP-এর প্রথম বড় পুরভোটের পরীক্ষাতেই সরাসরি বোর্ড দখল। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার শক্তঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ঝালওয়ার পুরপরিষদে বিশাল জয় পেয়েছে কংগ্রেস, বিকানেরও তাদের দখলে গিয়েছে। তবে যোধপুরে দুই প্রধান দলের লড়াই গিয়ে ঠেকেছে সমানে সমানে। জেন জি ভোট বিজেপির বিপক্ষে গিয়েছে। যেটা খুব একটা শুভ সংকেত না বিজেপির জন্য।
ঝালওয়ার পুরপরিষদের ৪৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি ওয়ার্ডে জয়লাভ করেছে কংগ্রেস। সেখানে বিজেপি পেয়েছে মাত্র ১৩টি আসন। দুটি জিতেছে নির্দল প্রার্থীরা এবং একটি গেছে AAP-এর ঝুলিতে। এই ফলাফল রাজস্থানের রাজনীতিতে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ঝালওয়ার-বারান লোকসভা কেন্দ্রটি বহু বছর ধরে বসুন্ধরা রাজে এবং তাঁর পুত্র দুষ্মন্ত সিং-এর শক্তঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। যেখানে বর্তমানে দুষ্মন্ত সিং বিজেপি সাংসদ। ফলে ওই জায়গায় পরাজয় বিজেপির কাছে সেটব্যাক হিসাবে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তবে বসুন্ধরা রাজের নিজস্ব বিধানসভা কেন্দ্র ঝালরাপাটনে জয় ধরে রাখতে পেরেছে বিজেপি।
এবার আসা যাক আজমেরে। আজমেরেও বিজেপির জন্য ভোটের ফল খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ৮০ আসনের আজমের পুরসভায় কংগ্রেস পেয়েছে ৩৭টি আসন, বিজেপি ৩২টি এবং নির্দলরা পেয়েছে ১১টি আসন। অর্থাৎ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কারও নেই। এখানে বিজেপির দীর্ঘদিনের দখল ভেঙে তৈরি ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি। আজমের বিজেপির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। সেখানে এই ফলাফল কিছুটা অপ্রত্যাশিত।
যোধপুরে বিজেপি বনাম কংগ্রেস টাই ম্যাচ
কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াতের শহর যোধপুরে চরম নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যোধপুর পুরনিগমের ১০০টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ৪৪টি আসন। কংগ্রেসও পেয়েছে ৪৪টি আসন। আর বাকি ১০টি আসন গেছে নির্দলদের হাতে। অর্থাৎ এই যোধপুরে বিজেপি বনাম কংগ্রেস একেবারে টাই। প্রশ্ন বোর্ড কে গঠন করবে? উত্তরটা নির্ভর করছে ওই ১০ নির্দল জয়ী পুর সদস্যদের উপর।
অন্যদিকে বিকানের জেলার নোখা নগরপালিকায় লাল ঝাণ্ডা উড়েছে। অর্থাৎ সেখানে জয়ী হয়েছে সিপিএম। নোখা পুরসভার ৪৫টি আসনের মধ্যে ২৯টিতেই জিতেছে সিপিএম। বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে ১৩টি ওয়ার্ড। তিনটি ওয়ার্ড পেয়েছেন নির্দল প্রার্থীরা। আর কংগ্রেস খাতাই খুলতে পারেনি। অন্যদিকে বিকানের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে জয় পেয়েছে কংগ্রেস। মোট ৮০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪২টিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাসিল করেছে তারা।
২০২৮ এর বিধানসভা ভোটের সেমিফাইনাল কি এই পুরভোট?
রাজনীতিতে স্থানীয় নির্বাচনকে সরাসরি বিধানসভা নির্বাচনের ফল হিসাবে দেখা বড় ভুল। তবে পুরভোটে একটা জিনিস স্পষ্ট। শহুরে ভোটারদের মুড একরকম নয়। জয়পুরে বিজেপি ৭৮টি আসন পেয়েছে। উদয়পুরে ৮০টির মধ্যে ৫৩ আসন জিতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। কোটাতেও বিজেপি ১০০টির মধ্যে ৫৫টি আসন পেয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে ঝালওয়ারে কংগ্রেস বড় জয় পেয়েছে। আজমেরেও বিজেপি দুর্গে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। যোধপুর টাই। পালিতে এগিয়ে কংগ্রেস। আর বারানে AAP-এর সরাসরি বোর্ড দখল। সুতরাং রাজস্থানে পুরভোটের ফল একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে বিজেপি কিছুটা এগিয়ে থাকলেও তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে কংগ্রেস। AAP এখনও ছোট কিন্তু উপেক্ষা করার মতো নয়। অন্যদিকে সিপিএমও পুরভোট দখল করেছে।
মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। কংগ্রেসকেও ভোট দিয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে বহু ভোটার দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়েও নির্দল প্রার্থীকে বেছে নিয়েছেন। এবার আসা যাক রাজস্থানের ফলাফল থেকে কী কী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এল
এক– বিজেপি শহরাঞ্চলে এখনও শক্তিশালী। পুরভোটে বিজেপির এগিয়ে থাকা দেখিয়ে দিল, শহরাঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক ক্ষমতা এখনও বড় সম্পদ।
দুই–কংগ্রেস শেষ হয়ে যায়নি। বহু ওয়ার্ড এমনকী পুরসভাও জিতেছে কংগ্রেস। অর্থাৎ, বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা এখনও ফুরিয়ে যায়নি কংগ্রেসের। কিন্তু সেই লড়াইকে রাজ্যজুড়ে আরও কার্যকর করতে হবে।
তিন– নির্দল শুধু আয়ারাম গয়ারাম নন। যেখানে বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত কম, সেখানে নির্দল কাউন্সিলরাই হয়ে উঠতে পারেন কিং মেকার।
২০২৮ সালের বিধানসভা ভোটের জন্য এই ফল কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
পুরভোটকে সরাসরি বিধানসভা ভোটের সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না। কারণ লোকাল বডি ইলেকশন-এ প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, স্থানীয় বিষয়, জনপ্রিয়তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারপরেও এই ফল থেকে একটা ট্রেন্ড স্পষ্ট। রাজস্থানের শহুরে ভোটারদের অধিকাংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকে থাকলেও কংগ্রেস কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। কংগ্রেসের সামনে তাই এখন থেকেই সংগঠন মজবুত করার চ্যালেঞ্জ। রাজনীতিতে ভোটারের শেষ কথা সবসময় দুই বড় দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজস্থানের এই ফলাফল ফের একবার সেটাই প্রমাণ করে দিয়েছে।