ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ ?

হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর, দুটি বিষয়ই এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের একের পর এক অনুরোধ। অন্যদিকে সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে গিয়েছে পরিস্থিতির ছবিটা। শনিবার তারেক রহমানের ভারত সফর প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিল। রবিবারই ঢাকা জানিয়ে দিল ভারতকে আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর সেই পরিবেশ তৈরির অন্যতম শর্ত হিসেবে সামনে এসেছে শেখ হাসিনা-সহ বাংলাদেশে পলাতক অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণের দাবি। ফলে হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর, দুটি বিষয়ই এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ইতিমধ্যেই ভারতের কাছে একাধিক অনুরোধবার্তা পাঠিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এই পরিস্থিতিতে হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে নয়াদিল্লি কী অবস্থান নেবে তা নিয়েও তৈরি হয়েছে কৌতূহল। একটি প্রতিবেদনে শীর্ষ পর্যায়ের এক ভারতীয় আধিকারিককে উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে, হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি ভারত সরকার একক ভাবে নির্ধারণ করতে চাইছে না। বরং দেশের আদালতগুলির সিদ্ধান্তের উপরই বিষয়টি ছেড়ে দিতে চাইছে নয়াদিল্লি। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়াই হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

এই আবহেই সামনে এসেছে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রকের তরফে রবিবার জানানো হয়েছে, সফরের জন্য ভারতকে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ঢাকা মনে করছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই কারণেই ভারতের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশে থাকা অন্যান্য পলাতক অভিযুক্তদের দ্রুত প্রত্যর্পণের পাশাপাশি ওসমান হাদি হত্যামামলায় অভিযুক্তদেরও বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। ফলে তারেকের সফর এখন শুধু একটি কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয় বরং একাধিক আইনি এবং রাজনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশ গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই যোগাযোগ রাখছে। অর্থাৎ সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা যে চলছিল তা স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ অগস্ট দিল্লিতে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রকের বক্তব্য, এই ধরনের পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রক্রিয়ার অনুকূল পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই এখন ভারত কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তারেক রহমানের ভারত সফর কি তাহলে পিছিয়ে যেতে পারে? নাকি সফরকে ঘিরে চলা কূটনৈতিক আলোচনা নতুন কোনও সমঝোতার দিকে এগোবে? কারণ, শনিবারের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০ থেকে ২৫ অগস্টের মধ্যে ভারতে আসতে পারেন তারেক রহমান। কিন্তু তার মাত্র একদিন পরেই বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রকের বক্তব্যে পরিস্থিতিতে নতুন মোড় দেখা গেল। ঢাকা স্পষ্ট করে দিল, শুধু সফরের দিনক্ষণ ঠিক করলেই হবে না, তার আগে প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ। আর সেই পরিবেশ তৈরির দায়িত্বের একটি বড় অংশ ভারতের উপরেই চাপিয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ থেকে শুরু করে ওসমান হাদি হত্যামামলায় অভিযুক্তদের হস্তান্তর। একাধিক বিষয়কে সামনে রেখে নয়াদিল্লির কাছে দ্রুত পদক্ষেপের বার্তা দিয়েছে ঢাকা। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এই কূটনৈতিক আলোচনার গতিপথের উপর।

এই গোটা পরিস্থিতির মধ্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডের পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ঢাকার চাপ ক্রমশ বাড়ছে। অন্যদিকে ভারত চাইছে বিষয়টি দেশের আইনি কাঠামোর মধ্যেই এগোক। নয়াদিল্লি সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বদলে আদালতের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে চাইছে। ফলে বাংলাদেশের অনুরোধের পরেও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি রয়েছে ওসমান হাদি হত্যামামলা। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রকের তরফে এই মামলায় অভিযুক্তদেরও ফেরত চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকেই নয়, আরও কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়কেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোচনার অংশ করেছে। এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। একদিকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে একাধিক আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন সেই সম্পর্কের উপর চাপ তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে যে পরিবর্তন দেখা গেল, তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। শনিবার সফর প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার খবর, রবিবারই আবার অনুকূল পরিবেশের শর্ত এই বদল থেকেই বোঝা যায়, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর থাকবে নয়াদিল্লির পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার দিকে। বাংলাদেশ যে বার্তা দিয়েছে, তার জবাবে ভারত কী অবস্থান নেয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয় এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের দিনক্ষণ আদৌ চূড়ান্ত হয় কি না। এই তিনটি প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপাতদৃষ্টিতে একটি বিদেশ সফরকে ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তার কেন্দ্রে এখন উঠে এসেছে প্রত্যর্পণ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণ। এখন দেখার, ঢাকার দাবি এবং নয়াদিল্লির আইনি অবস্থানের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণ তৈরি হয়। আর সেই সমীকরণই বা তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের পথ কতটা মসৃণ করে। আপনাদের কী মনে হয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের দাবি কি মেনে নেবে ভারত? আর এই ইস্যুর জেরে কি আদৌ পিছিয়ে যেতে পারে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর? সেই প্রশ্নই এখন উঠছে।