SIR: নির্বাচন কমিশনকে তলব সুপ্রিম কোর্টের

LOGICAL DISCREPANCY অর্থাৎ যুক্তিগত অসঙ্গতি। SIR নিয়ে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক; দিল্লির ভোটার তালিকার SIR নিয়ে এবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের প্রশ্নের কেন্দ্রে একটি শব্দ- LOGICAL DISCREPANCY অর্থাৎ যুক্তিগত অসঙ্গতি। এই LOGICAL DISCREPANCY আসলে কী? কোন তথ্যের গরমিলকে এই ক্যাটাগরিতে ফেলা হচ্ছে? আর কেন এই ধরনের নোটিস নিয়ে প্রশ্ন তুলল দেশের শীর্ষ আদালত? চলুন, পুরো বিষয়টি সহজ করে বুঝে নেওয়া যাক।


তার আগে আমরা একটু পিছনের দিকে দেখে নেব। বিহার থেকে শুরু এসআইআরের এতদিন অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও দেশের মানুষ এখনও পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি সম্পর্কে বুঝে উঠতে পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় কি নির্বাচন কমিশনের নয়? বাংলায় যখন এই যুক্তিগত অসঙ্গতির দরুণ লাখো লাখো নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হল, তখন কিছু রাজনৈতিক দল ওই বাদ পড়া ভোটারদের অনুপ্রবেশকারী-বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাংলায় এসআইআর-এ বাদ পড়া ভোটারদের ৯৩ শতাংশেরই নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় তোলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে কর্নাটকের বাসিন্দা ভারতরত্ন ৯২ বছর বয়সী অধ্যাপক সি.এন.রাও-ও ভুক্তভোগী এই যুক্তিগত অসঙ্গতিতে। তাঁর নামের বানানের আগে প্রফেসর শব্দে একটি f অতিরিক্ত যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই কারণে এসআইআর নোটিস যায় অধ্যাপক রাওয়ের কাছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের কাছেরও এসআইআর প্রক্রিয়ার নোটিস গিয়েছিল। তিনিও শুনানির মুখে পড়েছিলেন।


এবার আসি দিল্লির কথায়। দিল্লিতে প্রায় ৩৩ লক্ষ ভোটারদের কাছে logical discripancy-র নামে নোটিস পাঠানো হয়েছে। তাঁদের কোথায় অসঙ্গতি সেটা কমিশন ভালো জানে। তবে এই যে লাখ লাখ মানুষ-তাঁরা কি অনুপ্রবেশকারী, বাংলাদেশি না অন্য কোনও দেশের নাগরিক? বাংলার বেলায় তো খুব সহজেই অনুপ্রবেশকারী হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়, দিল্লির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য কী?

দিল্লিতে ভোটার তালিকার SIR চলছে। এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের পুরনো ও বর্তমান তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এই যাচাইয়ের সময় কিছু ভোটারের তথ্যের মধ্যে গরমিল ধরা পড়লে তাঁদের নোটিস দেওয়া হচ্ছে। এরই একটি ক্যাটাগরি- লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। সহজ ভাষায় বললে, ভোটারের নিজের তথ্য, বাবা-মায়ের তথ্য, বয়স, পরিবারের সদস্যদের তথ্য বা আগের ভোটার তালিকার তথ্যের মধ্যে এমন কিছু অসঙ্গতি, যা কমিশনের ডেটা-ভিত্তিক যাচাইয়ে ধরা পড়ছে-সেগুলিকে এই ক্যাটাগরিতে রাখা হচ্ছে।তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি মানেই ওই ব্যক্তি ভোটার হিসেবে অযোগ্য-এমন নয়। এটি মূলত যাচাইয়ের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এরপর সংশ্লিষ্ট ভোটারকে তথ্য বা নথির মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করার সুযোগ দেওয়ার কথা।

লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি কী?
পুরনো ও বর্তমান তথ্যের গরমিল
নিজের নাম বা পারিবারিক তথ্যের অসঙ্গতি
বয়স-সংক্রান্ত অস্বাভাবিকতা
বাবা-মা বা পরিবারের তথ্যের সঙ্গে ডেটা না মেলা
আগের SIR-এর তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্যের অসামঞ্জস্য

তবে এই ক্যাটাগরির সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট।আদালতে মামলাকারীদের বক্তব্য, বহু ভোটারকে LOGICAL DISCREPANCY দেখিয়ে নোটিস দেওয়া হলেও ঠিক কোন তথ্যের মধ্যে কী অসঙ্গতি রয়েছে, সেটি সবসময় পরিষ্কারভাবে জানানো হচ্ছে না। ফলে ভোটার বুঝতে পারছেন না-কোন নথি দিয়ে তাঁকে আসলে কী প্রমাণ করতে হবে। মামলাকারীদের দাবি, দিল্লির খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৪৭ লাখ নাম বাদ পড়েছে, আর প্রায় ৩৩ লাখ ভোটারকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যান নিয়েই শুনানিতে স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই পরিস্থিতিতেই মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চ বিষয়টি শোনে।

আদালত নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করে— লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, সেটি আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বিচারপতি বাগচী জানতে চান, এত বিপুল সংখ্যক নোটিস কি প্রায় যান্ত্রিকভাবে চলে যাচ্ছে কি না এবং নোটিস পাঠানোর আগে আরও কিছু ফিল্টার ব্যবহার করা যায় কি না। অর্থাৎ, আদালতের প্রশ্ন শুধু নোটিস দেওয়া হয়েছে কি না—তা নয়। প্রশ্ন হল, কোন ভিত্তিতে একজন ভোটারকে নোটিসের আওতায় আনা হচ্ছে এবং তাঁকে কীভাবে সেই অভিযোগ বা অসঙ্গতির জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের-এর প্রশ্ন

মামলাকারীদের বক্তব্যে আরও কিছু উদাহরণ উঠে আসে। যেমন, কোনও ভোটারের সঙ্গে তাঁর বাবা-মায়ের বয়সের ব্যবধান, পরিবারের সদস্যদের তথ্য বা বয়স-সংক্রান্ত কোনও অস্বাভাবিকতা যদি কমিশনের ডেটাবেসে ধরা পড়ে, তাহলে সেটি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। এই ধরনের কিছু মানদণ্ড নিয়ে আগের SIR-সংক্রান্ত মামলাতেও আদালতের নথিতে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বাবা-মায়ের নামের অমিল, বাবা-মায়ের বয়সের অমিল এবং পরিবারের তথ্য-সংক্রান্ত কিছু অসঙ্গতিকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-র উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—একটি ডেটা-অসঙ্গতি কি নিজে থেকেই একজন বৈধ ভোটারের নাগরিকত্ব বা ভোটার হিসেবে যোগ্যতার বিষয়ে সন্দেহ তৈরি করে?মামলাকারীরা এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কমিশনের পক্ষ অবশ্য আদালতে জানিয়েছে, নোটিসে কারণ উল্লেখ করা হয় এবং যাচাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট নথির তালিকাও রয়েছে। কমিশন আরও জানিয়েছে, ওই ১২টি নথিই চূড়ান্ত বা সম্পূর্ণ তালিকা নয়।

সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে-মানবিক সহায়তা। আদালত জানতে চায়, এত বিপুল সংখ্যক নোটিসের জবাব দিতে ভোটারদের সাহায্য করার মতো পর্যাপ্ত কর্মী রয়েছে কি না।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় ১৪ হাজার BLO এবং ১,২০০ ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ERO মোতায়েন রয়েছে।
কমিশন আদালতকে আশ্বাস দিয়েছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হবে না। দিল্লির SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-র সংজ্ঞা কী, নোটিসের ভিত্তি কী এবং ভোটারদের জন্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি ঠিক কীভাবে পরিচালিত হবে, কমিশনের জবাবের পরই পুরো বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এবার আসা যাক সম্প্রতি কমিশনের অন্দরের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে সেই কথায়। ভোটার তালিকায় নাম তোলা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটারের ফর্ম বদল, ভোটার-তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, এমনকী পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের নাম পুনর্বহাল নিয়ে আপিল-নির্বাচন কমিশনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েই কমিশনের অন্দরে গুরুতর মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত ভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। বারবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে দুই নির্বাচন কমিশনার অনেক কিছুতেই বারণ করলেও তিনি শোনেননি বলেই এমনই তথ্য উঠে এসেছে একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায়। ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নিজের মনের মতো সিদ্ধান্ত নেন বলে আক্রমণ শানিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল।