জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে এককাট্টা বিরোধীরা

জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে সরানোর দাবিতে সোচ্চার বিরোধীরা, জাতীয় স্তরে বাদ ১৩ কোটিরও বেশি নাম!

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক; SIR: ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে এবার নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই কি তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন? ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তমূলক রিপোর্ট সামনে আসতেই জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। রিপোর্টে দাবি, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে দুই কমিশনার-সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি-গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়-নতুন ভোটার যুক্ত করা, ভোটার বাদ দেওয়া, ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ এবং SIR-এর প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল বলে দাবি রিপোর্টে। আর এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরই দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে সরব বিরোধীরা

কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি থেকে ডিএমকে, শিবসেনা UBT-বিভিন্ন বিরোধী দল তুলেছে তদন্ত, SIR স্থগিত এবং জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি। কিন্তু আসল প্রশ্ন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টে ঠিক কী উঠে এসেছে? ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিহারে শুরু হওয়া SIR পরবর্তীতে দেশের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, জাতীয় স্তরে SIR-এর প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আর এই প্রক্রিয়া নিয়ে এবার নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তির কথা সামনে এসেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্ত অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি-১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ছিল নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির নিয়ম, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার ডেটাবেসের অ্যাক্সেস সংক্রান্ত বিষয়। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, নতুন ভোটারদের জন্য Form-6-এ SIR-এর আগের ভোটার তালিকায় আবেদনকারী বা তাঁর বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমার নাম থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। দুই কমিশনারের একজন এই পরিবর্তনকে UNAUTHORISED এবং ILLEGAL বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে রিপোর্টে। তা হল ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ। ওই ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী, দুই কমিশনার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ভোটার ডেটাবেসের অ্যাক্সেস ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য ছিল, যে সমস্ত বিধিবদ্ধ অথরিটি স্থানীয় স্তরে ভোটার তালিকা পরিচালনা করে, তাদের পর্যাপ্ত অ্যাক্সেস থাকা উচিত।এমনকি ভোটার ডেটাবেসের নিরাপত্তা এবং সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল বলে দাবি রিপোর্টে। পশ্চিমবঙ্গের SIR নিয়েও রিপোর্টে আলাদা করে উল্লেখ রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভোটার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু আপিল কেন এবং কার অনুমতিতে করা হয়েছিল-তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল কমিশনের ভিতরে। অর্থাৎ, বিতর্কটা শুধু SIR-এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নয়। প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও।

আর এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক ময়দানে শুরু হয়েছে বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া। বিরোধীদের বক্তব্য-যদি কমিশনের দুই সদস্যই একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়ে থাকেন, তাহলে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং SIR-এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।

প্রথমেই কংগ্রেস। কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল দাবি করেছেন, জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে সরানো উচিত এবং সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম আবার কমিশনের সাম্প্রতিক বছরগুলির সিদ্ধান্তগুলি সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনার দাবি তুলেছেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে লেখেন, ভোটচুরি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে হওয়া একটি অপরাধ। এটা আমাদের সংবিধানকেও সরাসরি আক্রমণ। বিজেপি, আরএসএস এবং নির্বাচন কমিশন- যারা এসবের উদ্যোক্তা, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করছে।

বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই বিতর্কে সরব হয়েছেন। তাঁর দাবি, SIR-এর আগের ভোটার তালিকা ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বিধানসভা নির্বাচন হওয়া উচিত। কমিশনের বিরুদ্ধে ফের এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটচুরি এবং ইভিএম হাইজ্যাক-এর অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারি চেয়েছেন মমতা।

অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন-যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে এত গুরুতর প্রশ্ন উঠছে, তখন সুপ্রিম কোর্ট কী পদক্ষেপ করবে?

উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব সুপ্রিম কোর্টকে বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ না করলে সেই সময়ে গঠিত সরকারগুলির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে DMK প্রধান এম কে স্ট্যালিন দাবি করেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদে থাকা উচিত নয় এবং SIR বন্ধ করা উচিত। স্ট্যালিনের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের ভিতরে যা ঘটেছে, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

মহারাষ্ট্র থেকেও এসেছে কড়া প্রতিক্রিয়া। শিবসেনা UBT প্রধান উদ্ধব ঠাকরে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর পাশাপাশি তাঁকে গ্রেফতারের দাবিও তুলেছেন। তিনি বলেছেন, দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত আপত্তি বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে নির্বাচন করার দাবিও জানিয়েছেন উদ্ধব। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হল-তিন সদস্যের কমিশনের দুই সদস্য বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন।

এই বিষয়ে বিজেপির কি প্রতিক্রিয়া?বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিরোধীদের অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছেন।তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিনিময় এবং মতপার্থক্য থাকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।তিনি SIR-কে কমিশনের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া একটি প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার অভিযোগ করেছেন। বিরোধীদের প্রশ্ন-কেন কমিশনের দুই সদস্যকে একাধিকবার আপত্তি জানাতে হল?বিজেপির বক্তব্য-কমিশনের ভিতরে আলোচনা এবং মতপার্থক্য থাকা মানেই প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে, এমন নয়।

একদিকে SIR নিয়ে ভোটার তালিকার ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য।আর তার মাঝখানে প্রশ্ন—ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ ভোটারের আস্থা কীভাবে বজায় থাকবে? ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধীরা ইতিমধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, SIR স্থগিত এবং তদন্তের দাবি তুলেছে।অন্যদিকে বিজেপি বলছে, কমিশনের ভিতরের আলোচনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ।এখন নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতের অবস্থানের দিকে।SIR নিয়ে বিতর্ক যে এখানেই শেষ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট।
বেআইনি ভাবে নিয়োগ, পক্ষপাতদুষ্টতা, এসআইআর সংক্রান্ত অনিয়ম, অসদাচরণ-সহ সাত দফা অভিযোগ তুলে ছ’মাস আগেই জ্ঞানেশকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে সরানোর জন্য সংসদে প্রস্তাব এনেছিল ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শিবির। কিন্তু গত এপ্রিলে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সিপি রাধাকৃষ্ণণ তা খারিজ করে দিয়েছিলেন।