জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিল সিজেপি।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগের জন্য দেওয়া হয়েছে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা। আজ, শনিবারের মধ্যে পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর, গান্ধীজয়ন্তী থেকেই দেশজুড়ে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। সিজেপির নেতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, আন্দোলনের শুরু হবে মুম্বই থেকে। তারপর দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে সেই কর্মসূচি। কিন্তু কেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি উঠছে? এর পিছনে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে প্রকাশ্যে আসা মতবিরোধ, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং SIR ঘিরে বিতর্ক।
বৃহস্পতিবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের দাবি জানিয়েছিল সিজেপি। শুক্রবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে দলের প্রধান অভিজিৎ দীপকে ফের জানান- শনিবারের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর মুম্বই থেকে আন্দোলন শুরু করবে সিজেপি। তাদের দাবি, পরে দেশের বিভিন্ন শহরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, এখন নজর শনিবারের দিকে। তবে এটি একটি রাজনৈতিক দলের দাবি এবং আন্দোলনের ঘোষণা- মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের কোনও সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এই দাবি ওঠার সময়েই নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতবিরোধ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে ছিল- ভোটার তালিকায় নতুন নাম যোগ করা, নাম বাদ দেওয়া, নাম পুনর্বহাল করা, SIR প্রক্রিয়া, এবং ভোটার ডেটাবেস ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই কমিশনারের অভিযোগ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের যথেষ্টভাবে অবহিত না করেই নেওয়া হয়েছে।
SIR নিয়ে এত বিতর্ক কেন?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে Special Intensive Revision বা SIR। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারের নাম নিশ্চিত করা এবং অযোগ্য বা মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা ডুপ্লিকেট নাম চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় নাম বাদ দেওয়া এবং নাম যুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সান্ধু এবং জোশী SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেওয়া ও নতুন নাম যুক্ত করার কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকি নতুন ভোটারদের জন্য Form 6-এ কিছু পরিবর্তন নিয়েও তাঁরা আপত্তি তোলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
১৪ বার আপত্তি, তারপর কী?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির সংখ্যা অন্তত ১৪। তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সামনে এসেছে। India Today-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যেও তিন নির্বাচন কমিশনার একাধিকবার যৌথভাবে সাংবাদিকদের সামনে এসেছেন এবং কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতেও একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন। অর্থাৎ, অন্দরে মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে এলেও কমিশন প্রকাশ্যে নিজেদের কাজ চালিয়ে গিয়েছে।
কমিশনের বক্তব্য কী?
বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের তরফে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে কোনও বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কমিশনের প্রক্রিয়া মেনেই এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, মতবিরোধ থাকলেও সেটিকে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে আলাদা করে দেখা উচিত- এমনটাই কমিশনের বক্তব্য। এই ব্যাখ্যার পরেও অবশ্য বিতর্ক থামেনি। বরং বিরোধী দলগুলি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলেছে এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশে জ্ঞানেশ কুমারের দুটি কর্মসূচি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। শুক্রবার মেরঠে নবীন ভোটারদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ করার কথা ছিল। এছাড়া সোমবার বারাণসীতে ‘Gen Z’-এর সঙ্গে তাঁর একটি কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল। দুটি কর্মসূচিই আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি, চলতি বিতর্কের সঙ্গে কর্মসূচি স্থগিত করার কোনও সম্পর্ক নেই। কমিশনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সময়সূচি, অনুষ্ঠানস্থলের প্রাপ্যতা কিংবা প্রাকৃতিক কারণের মতো বিভিন্ন কারণে কর্মসূচির তারিখ বদলানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ, একদিকে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতবিরোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অন্যদিকে SIR এবং ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। তার মধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সিজেপি। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, ২ অক্টোবর মুম্বই থেকে শুরু হবে সেই আন্দোলন। এরপর দেশের বিভিন্ন শহরে কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।
সব মিলিয়ে, এখন গোটা বিতর্কের কেন্দ্রে তিনটি বিষয়- প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের অন্দরে দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তি। দ্বিতীয়ত, SIR এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন। আর তৃতীয়ত, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি এবং ২ অক্টোবর থেকে আন্দোলনের ঘোষণা। তবে অভিযোগ, রাজনৈতিক দাবি এবং নির্বাচন কমিশনের সরকারি বক্তব্য- এই তিনটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। এখন দেখার, শনিবারের মধ্যে পদত্যাগের দাবি ঘিরে কী অবস্থান নেয় কমিশন এবং ২ অক্টোবর মুম্বই থেকে ঘোষিত আন্দোলন বাস্তবে কোন পথে এগোয়।