জ্ঞানেশ কুমারের শিক্ষাগত যোগ্যতা জানেন?

আইএএস অফিসার থেকে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার, জ্ঞানেশ কুমারের শিক্ষাগত যোগ্যতা জানলে চমকে যাবেন

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ গত কয়েকদিন ধরে তাঁকে নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে দেশে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। সোশ্যাল মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদী ও জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে মিমের শেষ নেই। সত্যিই জ্ঞানেশ কুমারের প্রিয় স্যার নরেন্দ্র মোদী। জ্ঞানেশ কুমার তাঁর পদে বসার আগে থেকে কেন অধীররঞ্জন চৌধুরী থেকে রাহুল গান্ধী বারবার তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। সংবিধানের একটি স্বাধীন সংস্থা হয়েও কেন তাঁর বিরুদ্ধে বারবার বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কীভাবেই বা এই পদে তাঁর আসা। তাঁর এত বড় সাংবিধানিক পদে যোগদান নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। সব নিয়েই চর্চা করবো এই ভিডিওতে। তাইলেই বুঝবেন কেন গোটা দেশ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে একাট্টা।

একেবারে জন্মবৃতান্ত দিয়েই শুরু করি তাহলে। ৬২ বছর বয়সি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জন্ম উত্তরপ্রদেশের আগরায়। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জ্ঞানেশ আইআইটি কানপুর থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টস অফ ইন্ডিয়া (আইসিএফএআই) থেকে বিজনেস ফাইন্যান্স এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশগত অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। পড়াশোনায় তুখড় ও দক্ষ আইএস হিসাবেও তাঁর নাম রয়েছে।

কেরল ক্যাডারের ১৯৮৮ ব্যাচের আইএএস অফিসার জ্ঞানেশ। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি কেরল সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কেরিয়ারে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইন এর খসড়া তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এই আইনের মাধ্যমেই ১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীরকে প্রদত্ত বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করা হয়েছিল। যুক্ত ছিলেন শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গেও। এটি এমন একটি সংস্থা যা রামমন্দির নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তদারকি করেছিল

।এ ছাড়াও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে যুগ্ম সচিব এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সমবায় মন্ত্রকের সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন জ্ঞানেশ। লোকসভা নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার ঠিক আগে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে নির্বাচন কমিশনে যোগ দেন তিনি। এর পর গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৯ সালের ২৬ জানুয়ারি তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা । কিন্তু তার আগেই বিতর্কে এই জ্ঞানেশ কুমার।

জ্ঞানেশ কুমার তাঁর পদে আসিন হয়েছিলেন বিতর্কের মধ্য দিয়ে। কী সেই বিতর্ক। ২০২৩ এর আইনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে নির্বাচন প্যানেল থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার ফলে তিন সদস্যের প্যানেলে সরকারের দুজন প্রতিনিধি থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ২০২৩ সালের একটি আইনের অধীনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদের জন্য তাঁকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। প্যানেলের একমাত্র বিরোধী সদস্য হিসেবে রাহুল গান্ধী চেয়েছিলেন, ওই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা আবেদনের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হোক। কিন্তু কে শোনে কার কথা সব বিতর্ক পেরিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হন জ্ঞানেশ কুমার। শুধু কি পদ ২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী সরকারি কাজ বা যে কোনও পদক্ষেপের জন্য বিশেষ রক্ষাকবচ পান নির্বাচন কমিশনারেরা। জ্ঞানেশের সেই রক্ষাকবচও বাতিলের দাবি উঠেছে।

জ্ঞানেশের আমলে কংগ্রেস কয়েকটি রাজ্যে জয় পেয়েছে তবু কমিশন নিয়ে আপত্তি কেন রাহুল গান্ধীর।ভারতের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ভারতের একাধিক বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর কার্যকালে কংগ্রেস মোট ১টি রাজ্যে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় লাভ করেছে। ২০২৬ কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এককভাবে ৬৩টি আসনে জয়লাভ করে। পাশাপাশি এই আমলেই নিলাম্বুর বিধানসভা উপনির্বাচনেও কংগ্রেস প্রার্থী আরিয়াদান শওকত বিপুল ভোটে জয়ী হন।

আসাম বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ১৯টি আসনে জয় পায়। তামিলনাড়ুতে এই কংগ্রেস ৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মাত্র ২টি আসনে জয় পেয়েছে।পুদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ১টি আসনে জয়লাভ করে। এরপরেও কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমার নিয়ে সরব হন। রাহুল গান্ধীর মূল অভিযোগ ছিল, ফর্ম-৬ ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনে ভোট চুরি করা হচ্ছে। কর্ণাটকের মহাদেবপুরা বিধানসভা কেন্দ্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি দাবি করেন, সেখানে প্রায় ১১,৯৬৫ জন দ্বৈত ভোটার, ৪০,০০৯ জন ভুয়ো ও অবৈধ ঠিকানার ভোটার এবং নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম-৬ অপব্যবহার করে ৩৩,৬৯২ জন ভুয়া ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এরপরেই হয় এসআইআর। যদিও সেই সময়,কংগ্রেস জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অপসারণের কথা বললেও সেই আওয়াজ জোরদার হয়নি। কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী সংসদে বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন। অধীর চৌধুরীর অভিযোগ তিনি আগেই বুঝেছিলেন এভাবে বিতর্কের মধ্যে দিয়ে এক ব্যক্তিকে পদে বসানোয় কোনও অভিসন্ধি রয়েছে।

শুধু কি জ্ঞানেশ কুমার আমলা পদে থাকা তাঁর মেয়েকে নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। চলতি বছরে নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভের সময় বাংলার মেয়ে আকৃতি চৌধুরীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন জ্ঞানেশ-কন্যা তথা উত্তরপ্রদেশের নয়ডার জেলাশাসক মেধা রূপম। তার পর থেকে টানা পাঁচ মাস বিচার বিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আকৃতি। গত ২ সেপ্টেম্বর আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের ধারা বাতিল করার নির্দেশ দেয় এলাহাবাদ হাই কোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মেধা। সেই মামলা চলছে। এই নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি। মেয়ের বিতর্কের মোড় ঘুরতে না ঘুরতেই এবার বাবা। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও তাঁর গ্রেফতারির দাবি জোরালো হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টেও পিটিশন দায়ের। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ২ রা অক্টোবর থেকে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ককরোচ পার্টিও। অতএব আগামী দিনে জ্ঞানেশ কুমার নিয়ে জল কতদূর ঘোলা হয় সেটাই এখন দেখার।