একসময় বাংলার রাজনীতিতে একাই লড়াইয়ের ময়দান তৈরি করেছিলেন তিনি। আর আজ? সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই কি নিজের রাজনৈতিক লড়াই টিকিয়ে রাখতে ভরসা করতে হচ্ছে অন্যের কাঁধে? দিল্লির মাটিতে গিয়ে তাই কি বারবার কংগ্রেসের হাতটাই শক্ত করে ধরতে চাইছেন তৃণমূল নেত্রী? জ্ঞানেশ কুমার ইস্যুকে সামনে রেখে ইন্ডিয়া জোটের মঞ্চে মমতা-রাহুলের একসুর, পাশে সোনিয়া গান্ধী। ছবিটা কি শুধুই রাজনৈতিক সমীকরণ, নাকি বাংলায় হারানো জমি ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টার নতুন কৌশল? তাহলে কি মমতার রাজনীতিতে কংগ্রেসই এখন শেষ সম্বল?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক জীবনে শুরুর দিন থেকে তিনি যে কতটা লড়াকু, তা প্রমাণ দিয়ে গেছেন। মাটি কামড়ে তৈরি করেছেন নিজের রাজনৈতিক ভিত। সেই মমতার সঙ্গে আজ জুড়ে গেছেন প্রাক্তনের তকমা। বাংলায় অতি পরিচিত এক প্রবাদ, হাতি কাদায় পড়লে মাছিও লাঠি মারে। মমতার কার্যত এখন সেই কাদায় পড়ার মতো অবস্থা। সরকারে থাকাকালীন কার্যত সাপোর্ট সিস্টেম বলতে যাদেরকে দেখা যেত, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছেড়েছেন তাঁর হাত। এমন অবস্থায় শক্ত করে ধরতে চাইছেন দিল্লি ইন্ডিয়া জোটের হাত। বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠকে যোগ দেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
মূলত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য বুধবার দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের শরিকরা বৈঠকে বসলেও মমতার উদ্দেশ্য শুধু জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করা নয়। তিনি অন্য বিরোধীদের সাহায্য নিয়ে জ্ঞানেশ ইস্যুকে আঁকড়ে ধরে নতুন করে রাজ্যে রাজনৈতিক জমি তৈরির চেষ্টা করতে মরিয়া। অন্য শরিকদের মধ্যে তৃণমূল নেত্রীর মূল ভরসা সেই কংগ্রেস।
বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠকে বসে কংগ্রেস, তৃণমূল , সিপিএম-সহ ১৯টি দল। বেলা ১১টা থেকে বৈঠক শুরু হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে। সামিল হন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনিতে ইন্ডিয়া জোট ২৩ দলের। তবে এদিন ২০টি দল অংশ নেয় বৈঠকে। উদ্ধব ঠাকরে, হেমন্ত সোরেন অনলাইনে যোগ দেন। বৈঠকে গরহাজির ছিল এমকে স্ট্যালিনের দল ডিএমকে এবং অরবিন্দ কেজরীওয়ালের আপ।
এদিন ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের শুরুতেই মমতা বলেন, ভোটে হারের পর তিনি বাড়ি থেকে বেরোতে পারছেন না। বিজেপিকে স্বৈরাচারী আখ্যা দিয়ে মমতা অন্য জোট শরিকদের পথে নেমে আন্দোলনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তাঁর নিশানায় ছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এতদিন জ্ঞানেশকে তিনি সম্বোধন করতেন ভ্যানিশ কুমার বলে। তিনি ইন্ডিয়া জোটের মঞ্চে জ্ঞানেশকে বিনাশ কুমার বলে তোপ দাগেন। মমতার পর বক্তৃতা রাখেন রাহুল গাঁধী। লোকসভার বিরোধী দলনেতা বলেন, যাঁরা ভারতের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, তাঁদের শাস্তির বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হবে। তাঁরা কত বড় পদে রয়েছেন, সেটা মুখ্য বিষয় নয়। কোনও একজন ব্যক্তির চেয়ে দেশের গণতন্ত্র অনেক বড়।
এদিন তাৎপর্যপূর্ণভাবে মমতা যে ভোটচুরি ইস্যু নিয়ে এত হইচই করেন, একসময় কংগ্রেস তথা রাহুল গান্ধীও একইভাবে এই ইস্যুতে পথে নেমে আন্দোলন করেছেন। সেসময় তৃণমূল নেত্রী উদাসীন ছিলেন। বরং কংগ্রেসকে কটাক্ষ করতেও শোনা গিয়েছে তাঁকে। যদিও এদিন একই সুরে সুর মেলান দুজনে। এতকিছুর পরও সোনিয়া গান্ধী মমতাকে দূরে সরিয়ে রাখেনিনি। জোটের বৈঠকে তাঁকে পাশেই বসিয়েছিলেন সোনিয়া। মমতার বক্তব্যের পরে পিঠে হাত বুলিয়ে যথেষ্ট বাহবাও দিতে দেখা যায় তাঁকে।
একদিকে বৈঠকে যখন এই ছবি উঠে এল, অন্যদিকে বৈঠকের আগে ধরা পড়ে এক অন্য ছবি। যা আপাতত রাজনীতির অলি-গলিতে জল্পনা তৈরি করেছে। মল্লিকার্জুন খাড়্গের জন্য অপেক্ষারত কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী আচমকা সরে যান গেটের সামনে থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসছেন বুঝেই কি আচমকা সরে গেলেন তিনি? বৈঠকের সময় ও বৈঠকের আগের দুটো ছবি নিয়ে এখন আপাতত আলোচনা শুরু।
এদিন ভোটচুরির প্রতিবাদে এবং জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে সুর চড়ায় বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। অক্টোবর এবং নভেম্বরে গোটা দেশে একগুচ্ছ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা। ২ অক্টোবর, গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রার ডাক দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচি চলবে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত। ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর নির্বাচন সদনে মিছিল করে যাবেন বিরোধী সাংসদেরা।