জ্ঞানেশের ‘SIR’ সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারী,মন্তব্য সুপ্রিম বিচারপতির

দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই এসআইআর নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিল সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির মন্তব্য। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি দেশের লক্ষ লক্ষ নাগরিক ভোটাধিকার হারান, তাহলে সেই প্রক্রিয়া কি আদৌ সাংবিধানিক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এবার তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার মতো কোনও প্রক্রিয়াকে মেনে নেওয়া যায় না। এমন প্রক্রিয়া স্বভাবতই খামখেয়ালি বা স্বেচ্ছাচারী। শুধু তাই নয়, বিচারপতি ভূঁইয়ার মন্তব্য ভোটাধিকার থেকে নাগরিকত্বকে আলাদা করে দেওয়া মানে যেন শরীর থেকে আত্মাকে বের করে নেওয়া।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

রবিবার হায়দরাবাদের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারপতি বোধরাজ সাহনি স্মারক প্রতিযোগিতার সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আগেই আবেদন জমা পড়েছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিচারপতির এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। বিচারপতি ভূঁইয়ার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন-নাগরিকত্ব বহাল রেখে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হলে গণতন্ত্রের অবশিষ্ট থাকে কী? তিনি বলেন, কোনও প্রক্রিয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক যদি ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং নিজের দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হন, অর্থাৎ ভোটাধিকারহীন নাগরিকে পরিণত হন, তবে সেই প্রক্রিয়াটি স্বভাবতই স্বেচ্ছাচারী। কোনও রকম পাল্টা যুক্তি দিয়ে একে সমর্থন করা যায় না।

তিনি বলেন, ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের সর্বপ্রথম সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৯৫ সালের ভারতীয় সংবিধান বিলে, যা স্বরাজ বিল নামেও পরিচিত। গণপরিষদে সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, গণপরিষদে যে খসড়া সংবিধান নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল, তাতে দুটি প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদ ছিল, যদিও সেগুলি পরবর্তীকালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভারতীয় সংবিধান নাগরিকদের দুটো শ্রেণিতে ভাগ করে না। এক শ্রেণির নাগরিক ভোট দেবেন, আর অন্য শ্রেণির নাগরিক, দেশের নাগরিক হয়েও ভোট দিতে পারবেন না-এমন ব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারপতি ভূঁইয়া সংবিধানের ১৪ এবং ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গে টেনেছেন। সংবিধানের ৩২৬ ধারায় প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। আর আর্টিকেল ১৪-এর মূল কথা হল আইনের চোখে সমতা।

অর্থাৎ, কোনও নাগরিককে এমনভাবে ভোটাধিকার থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না, যাতে তিনি কার্যত নিজের দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারান। ভোটাধিকার যে শুধুমাত্র নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা নয়, সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর হাতিয়ারও তা বোঝাতে সরাসরি উদাহরণ দেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তিনি বলেন, একজন ধনকুবের হতে পারেন, আর একজন রিকশাচালক। কিন্তু দুজনেরই ভোট থাকবে এবং তাঁদের ভোটের মূল্য হবে সমান। বিচারপতির মতে, এটাই ভারতীয় সংবিধানের সমাজ বদলের দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর কথায়, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পেশার ভিত্তিতে ভোটের ওজন বদলায় না। এই সমান ভোটাধিকার গ্রহণকে ভারতে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে বর্ণনা করেন তিনি।

এসআইআর নিয়ে ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, ভোটার বাদ পড়া এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছে। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও জোরদার হচ্ছে। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিচারপতি ভূঁইয়ার ভোটাধিকার নিয়ে কড়া মন্তব্যকে হাতিয়ার করেছে বিরোধীরা।

বিচারপতি ভূঁইয়ার মতে, দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার গ্রহণ ছিল স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। ভারত যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বেছে নিয়েছে, তার অপরিহার্য উপাদান এটি। সেই কারণেই নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া নিছক তালিক সংশোধনের বিষয় নয়। তা সমতা, নাগরিকের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভিত্তির রক্ষারও প্রশ্ন।

প্রিয় দর্শক, আপনাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির এই মন্তব্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ? পদত্যাগের দাবির মধ্যেই বিচারপতি ভূঁইয়ার এই মন্তব্য কি আরও অস্বস্তিতে ফেলল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে?