সন্তানের নিথর দেহটা আর কোনওদিন ফিরে আসবে না। যে কোল একদিন সন্তানকে আগলে রেখেছিল, সেই কোলই আজ শূন্য। চোখের জল মুছলেও বুকের ভিতর জমে থাকা যন্ত্রণা কি আর মোছে? কিন্তু শোকের কাছে হার মানেননি তিনি। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বুকে নিয়েই শুরু হয়েছিল এক মায়ের লড়াই। আর ৯ অক্টোবর, সেই মায়ের নামই উঠে এল শিরোনামে। নন্দীগ্রামে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হাসিরানি রথ। রাজনৈতিক ময়দানে তাঁর এই জয় ঘিরে উচ্ছ্বাস পদ্মশিবিরে। কিন্তু এই জয়ের নেপথ্যে কি শুধুই রাজনীতির অঙ্ক? নাকি সন্তান হারানোর ক্ষত বুকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এক মায়ের গল্প? যে লড়াইয়ের শুরু কান্না দিয়ে, তার পরিণতি কি সত্যিই বদলে দিল নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণ?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
রাজ্যে পালা বদল ঘটেছিল পাঁচ মাস আগে। শুধু পালা বদল নয়। ঠিক তাঁর পরপরই এক মা হারিয়েছিলেন তাঁর ছেলেকে। কান্নায় দুচোখ শুধু ভরে ছিল সেই মায়ের। কিন্তু ফাঁকা কোল আর ভরাট হয়নি। ফাঁকা কোল হয়তো কোনওদিন ভরবে না। তবে ৯ অক্টোবর সেই হারানোর বদলা যেন নিল এক মা। সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন সন্তান হারানো এক মা। তাঁর বাহবায় ভাসছে পদ্ম শিবির। তাঁর আনন্দে আত্মহারা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ৭ মে বাড়ি ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। মোটরসাইকেলে করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে গাড়ি ফলো করা হয়েছিল তাঁর। মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া বলে একটি জায়গায় ছিলেন তখন। হঠাৎ একটি গাড়ি এসে তাঁর গাড়ির সামনে এসে হাজির হয়। তারপর একটি বাইক আসে, চন্দ্রনাথ গাড়ির যেদিকে বসেছিলেন ঠিক সেই দিকেই এসে গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালানো হয়। শেষ হয় শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ-এর জীবন। আহত হন তাঁর গাড়ি চালকও। সেখান থেকে শুরু হয় এক মায়ের লড়াই।
এক লক্ষ ভোটের ব্যবধান পেরিয়ে গেল এক লক্ষ বাইশ হাজার। উপনির্বাচনের ময়দানে কার্যত বিরোধীদের উড়িয়ে দিয়ে নন্দীগ্রামে গেরুয়া ঝড় হাসিরানি রথের। গণনার প্রথম রাউন্ড থেকেই যে দৌড় শুরু, শেষ পর্যন্ত সেই দৌড়ে বিজেপি প্রার্থীর ধারেকাছেও পৌঁছতে পারল না বিরোধীরা। শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে আসা আসনে পদ্মের এই বিপুল জয় কি নিছকই প্রত্যাশিত ফল, নাকি নন্দীগ্রামে নতুন করে শক্তি প্রদর্শন বিজেপির? আর লক্ষাধিক ভোটের এই ব্যবধানের পিছনে কি শুধুই শুভেন্দু-ফ্যাক্টর?
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের ভোটগণনার শুরু থেকেই দুই কেন্দ্রে এগিয়ে থাকে বিজেপি। এগিয়ে থাকে রেজিনগরের বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার। সুপারফাস্ট গতিতে এগোতে থাকে নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ। ১১ রাউন্ড গণনার শেষে দেখা যায় ৯০,২০৩ ভোটে এগিয়ে থাকেন নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ। যত রাউন্ড বাড়তে থাকে ততই বাড়তে থাকে জয়ের মার্জিনটা। ১৫ রাউন্ড গণনার শেষে নন্দীগ্রামে ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩ ভোটে জয়ী হন বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ। ভোট গণনার প্রথম থেকেই এগিয়ে থাকা হাসিরানি স্মরণীয় জয় ছিনিয়ে নেন। নিজের ছেড়ে আসা কেন্দ্র নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে হাসিরানি রথের হাত ধরে ওঠে গেরুয়া ঝড়। বিরোধীদের দুরমুশ করে নন্দীগ্রামে জয়ের ধারা এবারও অটুট রাখল ভারতীয় জনতা পার্টি।
১৫ রাউন্ড গণনার শেষে যখন নন্দীগ্রামে ১ লক্ষ ২২ হাজার ভোটে জয়ী বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ। তখন প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছিতে এসে দাঁড়ান কংগ্রেস প্রার্থী। ফলাফলের দিনে দাঁড়িয়ে ভোটে কারচুপির অভিযোগে সরব প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনী প্রচারে এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, এক লক্ষের বেশি ব্যবধানে ভোটে জিতবেন পদ্মপ্রার্থী হাসিরানি। বাস্তবে দেখা গেল সেই লক্ষ্য মাত্রা পেরিয়ে ১ লক্ষ ২২ হাজার ভোটে জয়লাভ করেন হাসিরানি রথ।
নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর ছেড়ে আসা আসনে হাসিরানি রথের এই বিপুল জয় কি শুধুই উপনির্বাচনের ফল, নাকি রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে শক্তি প্রদর্শন বিজেপির? একদিকে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে পদ্মের জয়, অন্যদিকে কারচুপির অভিযোগ তুলে সরব কংগ্রেস। সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিল, শুভেন্দুর গড়ে এখনও গেরুয়া ঝড়ের দাপট অটুট। তবে এই বিপুল জয়ের রাজনৈতিক প্রভাব আগামী দিনে রাজ্যের বিরোধী শিবিরের সমীকরণে কতটা বদল আনে, এখন সেটাই দেখার। রাজ্যে পালাবদলের পরে ফলতায় প্রথম উপনির্বাচন দেখেছিল বাংলা। সেবারে দেবাংশু পণ্ডা জিতেছিলেন ১ লক্ষ ৯ হাজার ভোটে। সেখানে হাসিরানি ভোট পেয়েছেন ১ লক্ষ ২২ হাজারেরও বেশি ভোট। অন্যদিকে, রেজিনগরে বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার পান ৭২ হাজার ৭১০ ভোট। সব দিক থেকে রেকর্ড ছুলেন হাসিরানি। চলতি বছরে বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে জিতেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম, দুটো আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। তবে ভবানীপুর আসনের জয়ী প্রার্থী হিসেবে শপথ নেন তিনি। নন্দীগ্রাম আসন ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচন। সেই আসনেই কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী জয় পেয়ে হাসিরানির মুখে চওড়া হাসি। ছেড়ে দেওয়া আসনে দাঁত ফোটাতে দিল না অন্য কোনও দলের।
সন্তানের মৃত্যুর ক্ষত কোনও ভোটের ফলেই মুছে যাওয়ার নয়। ফাঁকা কোলও আর কোনওদিন ভরবে না। তবু সেই শোক বুকে নিয়েই লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছিলেন এক মা। ৯ অক্টোবর নন্দীগ্রামের ফলাফল প্রকাশ্যে আসতেই লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হাসিরানি রথ। রাজনৈতিক মহলে এই জয়কে ঘিরে যতই চর্চা হোক, তাঁর লড়াইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা, বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। পদ্মশিবিরের উচ্ছ্বাসের মাঝেও তাই উঠে আসছে এক মায়ের চোখের জলের কথা। এই জয় কি তাঁর কাছে শুধু রাজনৈতিক সাফল্য, নাকি হারানো সন্তানকে ঘিরে জমে থাকা যন্ত্রণার মধ্যে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর নাম? উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে রয়েছে সেই মায়ের নীরব লড়াইয়ের মধ্যেই।